রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের 'সফট পাওয়ার' হিসেবে পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলগুলো পুনরায় মাঠে সক্রিয় হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক নেতাদেরও অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উদীচীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বিতর্ক
আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এই অনুষ্ঠানে সরকারের নিযুক্ত জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়েছেন। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর উদীচীর অধিকাংশ সংগঠক আত্মগোপনে গেলেও, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তারা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করে। যদিও উদীচীকে কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে দেখা হয়, এটি মূলত আওয়ামী লীগের একটি সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সিপিবি'র তৎপরতা ও বাধা
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে মাঠে তৎপরতা শুরু করেছে। গত ২৭ অক্টোবর 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে সিপিবি একটি মিছিল শুরু করলে পল্টনে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাতে বাধা দেয়। এছাড়া, দেশের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে সিপিবির নেতারা আওয়ামী লীগের 'বি টিম' হিসেবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে মৌলবাদ দমনের নামে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সিপিবির নেতারা সমর্থন দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশনের টকশোতে সিপিবির নেতাদের নিয়মিত আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতার বক্তব্য
সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি নিমচন্দ্র ভৌমিকের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন,
আমাদের সমাজের পাগুলো উপরে উঠে গেছে, আর মাথাগুলো নিচে পড়ে গেছে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম হতো, অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ বৃহৎ মাদরাসায় পরিণত হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের এই সংসদ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছর বেঁচে থেকে তিনি দেখতে চান—বাংলাদেশ বাঙালির থাকবে, নাকি স্বাধীনতা বিরোধীদের পাকিস্তানে পরিণত হবে। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার উপস্থিত ছিলেন।
নিমচন্দ্র ভৌমিকের বিতর্কিত অতীত
উল্লেখ্য, নিমচন্দ্র ভৌমিককে শেখ হাসিনা সরকার নেপালে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিল। রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে অপেশাদার ও অ-কূটনীতিসুলভ আচরণের অভিযোগ ওঠে। নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করে মোটরসাইকেলে ড্যান্সবারে যাতায়াত করতেন এবং কাঠমান্ডুতে একজন ভারতীয় কূটনীতিককে উত্ত্যক্ত করেন। এমনকি বলিউডের চিত্রনায়িকা মনীষা কৈরালার বাড়িতে গিয়ে উপদ্রব করার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। এসব 'অসভ্য' আচরণের কারণে নেপালের পররাষ্ট্র সচিব ঢাকার পররাষ্ট্র সচিবের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে নিয়োগ বাতিল করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভূমিকা
নিমচন্দ্র ভৌমিকের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন,
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যতটা এগিয়ে গিয়েছিল, দেশ আজ সেখান থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
আওয়ামী ইতিহাস প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিচিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগঠকরা দীর্ঘদিন নীরব থাকলেও, বর্তমানে সাংবাদিক প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে সামনে আসছেন।


