শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ব্যবহারে বাংলাদেশের দুর্বলতা, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা

ডেস্ক রিপোর্ট
৩ ঘণ্টা আগে
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ব্যবহারে বাংলাদেশের দুর্বলতা, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ব্যবহারে বাংলাদেশের দুর্বলতা, বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ২০৪৫ সালে এই জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সময়কাল শিখরে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে, ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ও পূর্বাভাস

মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত বয়সকাঠামোর পরিবর্তন এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের হাতে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর জন্য প্রায় দুই দশক সময় রয়েছে, যা ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা বেশি সময় পেলেও, কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, আগামী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে এই অঞ্চল বার্ধক্যপ্রবণ অর্থনীতিতে পরিণত হবে, যেখানে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশও ২০৫১ সালের মধ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীপ্রধান দেশে পরিণত হবে।

News details square ads

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জনমিতিক অবদান

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রতিবছর গড়ে ০.৪ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১.১ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার বয়সকাঠামোর এই সুবিধা স্থায়ী হবে না। ২০০০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনসংখ্যার বার্ষিক অবদান কমে ০.১ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো আগের তুলনায় দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। এ অবস্থায় উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখনই নীতিগত উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিতে হবে।”

কর্মসংস্থান ও দক্ষতার ঘাটতি

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ঘাটতিকে একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। অনুকূল বয়সকাঠামো থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

  • সীমিত আনুষ্ঠানিক চাকরি সৃষ্টি।
  • নারীদের শ্রমবাজারে কম অংশগ্রহণ।
  • দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী, অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও অনেককে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ধীর এবং সাম্প্রতিক সময়ে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেন, “বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন নেওয়া পদক্ষেপের ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে।”

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও দ্বিমুখী নীতি

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে রয়েছে। দীর্ঘায়ু বাড়লেও সুস্থ ও কর্মক্ষমভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই অনেকের। স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং পেনশন ব্যবস্থাও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত নয়। দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন এবং প্রবীণদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কভারেজগুলোর একটি।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক দ্বিমুখী নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে:

  1. তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি: উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা, ব্যবসায়িক বিধিবিধান সরলীকরণ এবং শিক্ষা ও দক্ষতার মান উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানে বিদ্যমান বাধা দূর করতে হবে।
  2. প্রবীণদের জন্য সুরক্ষা: প্রবীণদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও কার্যকর পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে, যা দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যার বয়সকাঠামোয় পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে আনছে। সময় থাকতে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা না গেলে এই পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]