পরিবারের একমাত্র ভরসা মাইশার অকাল প্রয়াণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত (২১) নিহত হয়েছেন। তিন বছর আগে ক্যান্সারে বাবাকে হারানোর পর মা সালমা আক্তার ও ছোট ভাইয়ের একমাত্র ভরসা ছিলেন মাইশা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের আগেই মঙ্গলবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে ডালাস পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। মাইশা প্রতিদিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে যাওয়ার জন্য সড়কের পাশে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় চট্টগ্রামমুখী ৮ নম্বর রুটের একটি লোকাল বাস যাত্রী ওঠানোর জন্য ধীরগতিতে চলছিল। পেছন থেকে একটি ভারী লরি বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গিয়ে সড়কের পাশে অপেক্ষারত শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।
হতাহত ও উদ্ধার তৎপরতা
বাসের নিচে চাপা পড়ে মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ও সহপাঠীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে বেলা ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাইশাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া, বহিরাগত আরও একজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের শোক ও প্রতিক্রিয়া
মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকার জানান, লরির ধাক্কায় বাস উল্টে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়লে মাইশা গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে মারা যান। উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজাদী ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসমত আলী হাসপাতালে ছুটে যান।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মাইশাকে বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ
মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটতকিয়া এলাকায় মাইশাদের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। যে মেয়েকে ঘিরে মা সালমা আক্তার স্বামী হারানোর কষ্ট ভুলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই মেয়েকেও অকালে হারাতে হলো। এই দুর্ঘটনা কেবল একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রাণ কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে অভিভাবকহারা একটি পরিবারের শেষ ভরসাও। যে মাইশা মুশফিরাত পড়াশোনা শেষ করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে এবং ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন, তার লাশ নিয়েই স্বজনদের বাড়ি ফিরতে হয়েছে।


