ভূমিকা: প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও শ্রমবাজারের বিবর্তন
ইতিহাসের প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই বিশ্বের কর্মসংস্থান এবং শ্রমবাজারের কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ব্যবহার প্রথম শিল্পবিপ্লব ঘটায়, যা হাতে করা কাজকে যন্ত্রনির্ভর করে তোলে। এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিদ্যুৎ ও ব্যাপক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রসারে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব অনেক পুরোনো দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়।
১৯৭০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশক পর্যন্ত ডিজিটাল বিপ্লব কম্পিউটার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে দাপ্তরিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক শারীরিক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে। টাইপিস্ট, টেলিফোন সুইচবোর্ড অপারেটর এবং প্রচলিত হিসাবরক্ষকদের মতো পেশাগুলো কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থার কাছে তাদের কার্যকারিতা হারায়। একই সময়ে, রোবট রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রোগ্রামিংয়ের মতো প্রযুক্তিনির্ভর নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগ: নতুন দিগন্ত ও উদ্বেগ
বর্তমানে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিপ্লবের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছি। এআই কেবল কাজের ধরন পরিবর্তন করছে না, অনেক পেশার সংজ্ঞাও নতুন করে তৈরি করছে। পূর্বাভাসভিত্তিক অ্যালগরিদম থেকে জেনারেটিভ এআই পর্যন্ত এই প্রযুক্তি মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান হারানো এবং কর্মীদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে মানুষ কতটা দ্রুত নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে নতুন চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে তার ওপর।

শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব: বিলুপ্তি ও নতুন সৃষ্টি
এআইয়ের প্রাথমিক প্রভাব পড়বে সেসব পেশায়, যেখানে একই ধরনের শারীরিক বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করতে হয়। অন্যদিকে, জটিল তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলো এআইয়ের কারণে সুবিধা পেতে পারে। স্বল্প মেয়াদে কিছু কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে এআই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশ্বজুড়ে ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, একই সময়ে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কর্মসংস্থানের পরিবর্তনের পাশাপাশি এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ১৩ লাখ কোটি ডলার যুক্ত করবে এআই, যা বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সম্মিলিত পরিমাণ ১৬ শতাংশ বাড়াতে পারে। তবে শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না; যাদের শিক্ষা ও দক্ষতার ভিত্তি দুর্বল, তাদের চ্যালেঞ্জ বেশি মোকাবিলা করতে হবে।
পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট: চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
ইউএনডিপি পাকিস্তানের উমের আখলাক মালিকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআইনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শ্রমশক্তিকে বেশ কিছু বড় বাধার মুখে পড়তে হবে। দেশটির মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক (এইচসিআই) মাত্র ০.৪১, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়ে কম। শিক্ষাজীবনের প্রত্যাশিত মেয়াদ ৯.৪ বছর হলেও শিক্ষার মান বিবেচনায় কার্যকর শিক্ষাবর্ষ কমে দাঁড়ায় ৫.১ বছরে।
পাকিস্তানের ২০২০-২১ সালের শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) অনুযায়ী, দেশটির মোট শ্রমশক্তির ৩৭.৪ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত, যেখানে এআইয়ের ব্যবহার তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, প্রায় ৪২ শতাংশ কর্মী কেরানির কাজ, সেবা, বিক্রয় এবং যন্ত্র পরিচালনার মতো নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক পেশায় যুক্ত। এআইয়ের মাধ্যমে এসব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে তারাই সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি: শ্রমশক্তির ৬১.৫ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক বা ম্যাট্রিকুলেশনের নিচে।
- কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব: মাত্র ৩.২ শতাংশ কর্মী কারিগরি বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
- ডিজিটাল বিভেদ: পাকিস্তানের ৪৬ শতাংশ মানুষের এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই।
- নারী শ্রমিকের ঝুঁকি: অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় এআইয়ের প্রভাবে বর্জ্য সংগ্রহ ও উৎপাদন খাতের কিছু কাজে পরিবর্তন এলে নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
তবে এআইনির্ভর ভবিষ্যতের পথে পাকিস্তানের অগ্রগতির কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশটিতে প্রতিবছর ২৫ হাজারের বেশি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতক তৈরি হচ্ছেন এবং বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে এআই বিষয়ে বিশেষায়িত ডিগ্রি চালু হয়েছে।
- ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রবৃদ্ধি: পাকিস্তানে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ২৩ লাখ ৭০ হাজার, যারা ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বৈদেশিক আয় দেশে পাঠিয়েছেন। ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বিশ্বে পাকিস্তানের অবস্থান তৃতীয়।
- নতুন শিল্প ও পেশার সুযোগ: এআই বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিজ্ঞানী, মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, রোবট প্রকৌশলী এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্মার্ট গ্রিড ও স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মতো এআইনির্ভর অগ্রগতিও নতুন পেশার পথ খুলে দিচ্ছে।
করণীয়: ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির কৌশল
এআই ও ডিজিটাল সাক্ষরতা, কারিগরি শিক্ষা এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। এআইনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য পাকিস্তানের শ্রমশক্তিকে প্রস্তুত করতে সরকার ও বেসরকারি খাত—উভয়কেই শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সরকারকে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এনে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষাক্রমে এআইভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডেটা সেন্টারের মতো ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার নীতিও গ্রহণ করা প্রয়োজন। বেসরকারি খাত এআই গবেষণা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের মাধ্যমে উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিতে পারে। শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্রম তৈরি, শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং এআইভিত্তিক নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপকে সহায়তা করতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করা উচিত। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব জোরদার করা গেলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি কমানো, কর্মীদের ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা তৈরি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।


