শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ: বিতর্কিত আইএলএফ কাণ্ডে বাতিল নিয়োগ প্রক্রিয়া

ডেস্ক রিপোর্ট
২ ঘণ্টা আগে
ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ: বিতর্কিত আইএলএফ কাণ্ডে বাতিল নিয়োগ প্রক্রিয়া
ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ: বিতর্কিত আইএলএফ কাণ্ডে বাতিল নিয়োগ প্রক্রিয়া
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সম্প্রসারণ প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস (পিএমসি) নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে বহুল বিতর্কিত আইএলএফ কনসালট্যান্টসকে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা। অভিযোগ উঠেছে, কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোকে প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ দিয়ে মাত্র ছয়টি কোম্পানির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেন এবং তড়িঘড়ি করে প্রস্তাবনার অনুরোধপত্র (আরএফপি) পাঠান।

প্রকল্পে বিনিয়োগকারী সংস্থা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) গ্রুপের তীব্র আপত্তির মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করতে বাধ্য হয়। গত ১৯ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের পরিকল্পনা-৪ শাখার উপসচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক স্মারকে বলা হয়েছে, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চিঠিতে চলমান আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বাতিল করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০২৫ অনুসরণ করে পুনরায় রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (আরইওআই) আহ্বান করতে বলা হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা

মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত চক্রটি বিপাকে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অসাধু চক্রের কারণেই গত ১৩ বছরেও ইআরএল সম্প্রসারণ প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয়নি। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পিএমসি নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের কারণে প্রকল্পটি আরও অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যেতে পারে।

News details square ads

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্বল তদারকির সুযোগে মাঝারি পর্যায়ের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে উঠেছে। এই কর্মকর্তারা এবং তাদের অধীনস্থরা প্রকল্পের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। পিএমসি নিয়োগের জন্য তৈরি করা ছয় কোম্পানির তালিকা এর একটি বড় উদাহরণ। তারা পারস্পরিক যোগসাজশ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য ও অনভিজ্ঞ কোম্পানির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেছেন।

বাছাই প্রক্রিয়ায় বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে ৩০ লাখ টন পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৫ মে আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করা হলে ২৩টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মনজুরুল আলম প্রধানের নেতৃত্বে গঠিত আট সদস্যের বাছাই কমিটি এই ২৩টি প্রতিষ্ঠান যাচাই-বাছাই করে ছয়টির সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করে।

তবে এই বাছাই প্রক্রিয়ায় গুরুতর অসঙ্গতি দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে ৩৭টিরও বেশি নতুন রিফাইনারি নির্মাণ এবং ৭০০টিরও বেশি বিশেষায়িত প্রসেস ইউনিট স্থাপন ও আধুনিকায়নের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইতালিভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানি সাইপেম এসপিএ এই বাছাই তালিকায় স্থান পায়নি। একইভাবে, বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে প্রায় ২,৬০০টি প্রকল্প সম্পন্ন করা স্পেনভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি টেকনিকাস রিইউনিডাস (টিআর)-কেও প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মূল্যায়ন কমিটি অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অনেক যোগ্য কোম্পানিকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানিকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান দিয়েছে।

আইএলএফ কনসালট্যান্টসের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং বাছাই কমিটির পক্ষ থেকে ‘এক্সিলেন্ট’ হিসেবে মূল্যায়িত হওয়া জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি আইএলএফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসটিপি-সৌদি টেকনোলজিক প্রজেট্টি এসপিএ-এর বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে লেনদেন ও ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত থাকার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে আইএলএফের বিরুদ্ধে। কাজ পাওয়ার জন্য কাজাখস্তানের সরকারি কর্মকর্তাদের আইএলএফ ঘুস দিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্টের (এফসিপিএ) তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিতর্কিত আইএলএফ এসপিএম প্রকল্পের জন্য সব প্রারম্ভিক সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল। তা সত্ত্বেও পিপিআরএ বিধি ৭১.৩ এবং ৭১.৪-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন করে তাদের এসপিএম প্রকল্পের পিএমসি এবং নির্মাণ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম মেগা প্রকল্প সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পে আইএলএফের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং নজিরবিহীন দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এই কোম্পানি প্রকল্পের মূল কারিগরি পরিকল্পনা, ডিজাইন রিভিউ ও মাঠ পর্যায়ের নির্মাণ তদারকির দায়িত্বে ছিল। পাইপলাইন ও সিস্টেম সম্পন্ন হওয়ার পরও সঠিক সময়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় বিপিসিকে অলস ঋণের কিস্তি বাবদ প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।

এছাড়াও, আইএলএফের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ও ডিজাইন রিভিউর মাধ্যমে তৈরি করা মহেশখালীতে সাগরের তলদেশের পাইপলাইন চালুর পর কয়েক ঘণ্টার মাথায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়, যা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজের মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি এড়িয়ে বিশেষ সুবিধায় ওঅ্যান্ডএম চুক্তি করার চেষ্টার কারণে রাষ্ট্রের আরও অতিরিক্ত ৩৬০ কোটি টাকা গচ্চা যাওয়ার উপক্রম হয়। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পিএমসি নিয়োগের ক্ষেত্রে কী কী যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা লাগবে, সেটি চূড়ান্তকরণেও আইএলএফের হাত ছিল।

অর্থায়ন চুক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে এক বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মিজানুর রহমান এবং আইএসডিবি গ্রুপের পক্ষে ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি এই চুক্তিতে সই করেন।

এই প্রকল্পের আওতায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরি করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫-৫০ শতাংশ পূরণ সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]