পটভূমি
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (টিসিএফ) বিপ্লব কুমার সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি খাদ্যগুদামের চালের বস্তা ছিদ্র করে চাল আত্মসাৎ, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার পয়েন্ট অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আদায় এবং বন্ধ থাকা মিল-চাতাল সচল দেখিয়ে চাল কেনার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ও কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে এককভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বস্তা ছিদ্র করে চাল আত্মসাৎ
স্থানীয় এলএসডি খাদ্যগুদামের কয়েকজন কর্মচারী ও শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার নির্দেশে গুদামে থাকা চালের বস্তা থেকে প্রতিটিতে এক থেকে আড়াই কেজি পর্যন্ত চাল বের করে নেওয়া হয়। বিশেষ করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের বস্তা থেকে এই অনিয়ম বেশি ঘটে। এছাড়াও সরকারিভাবে বিতরণের অন্যান্য বরাদ্দের বস্তা থেকেও চাল সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তাদের দাবি।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বদরগঞ্জে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৪০ জন ডিলার রয়েছেন। গত এক বছরে পাঁচবার এবং চলতি বছরে চারবার করে মোট নয়বার তাদের চাল দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারে একজন ডিলার সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ মেট্রিক টন চাল পান। ৩০ কেজির বস্তা থেকে ১ থেকে ১.৫ কেজি এবং ৫০ কেজির বস্তা থেকে ২ থেকে ২.৫ কেজি চাল সরিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে প্রতি ডিলারের বরাদ্দ থেকে ৫০০-৬০০ কেজি চাল আত্মসাৎ করা হয়, যা ৪০ জন ডিলারের ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৪ টন চালের সমতুল্য। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল থেকে প্রতি বছর ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ১১০ থেকে ১৩০ টন চাল আত্মসাৎ করে বিক্রি করা হয়। এছাড়াও রিলিফের চাল ও গুদামের মেঝেতে পড়ে থাকা চাল বিক্রি করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

উপকারভোগী মফিজন নেছা, শামসুন্নাহার ও সাইফুল অভিযোগ করেন, “৩০ কেজির বস্তায় প্রায় দুই থেকে তিন কেজি চাল কম থাকে। প্রতিবাদ করলে ডিলাররা গুদাম থেকেই চাল কম এসেছে বলে জানান। তাই আমরাও আর প্রতিবাদ করি না। কারণ ৩০ কেজি চাল ৪৫০ টাকায় পাই, তাই অনেকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না।”
ডিলার পয়েন্ট নিয়ে অর্থ আদায়
অভিযোগ উঠেছে যে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সারা দেশে কমিটির মাধ্যমে নতুন করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলেও, উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার কৌশলে আটটি ডিলার পয়েন্ট নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। পরবর্তীতে প্রতিটি পয়েন্ট ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যদের দিয়ে চাল বিতরণ করিয়ে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। আইনশৃঙ্খলা ও উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় ডিলারদের নাম উল্লেখ করে চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত ও রেজুলেশন হলেও খাদ্য কর্মকর্তা তা অনুসরণ করেননি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন।
সমন্বয় কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি অধ্যাপক আহসান হাবিব বলেন, “খাদ্য কর্মকর্তার নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি ওপেন সিক্রেট। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং এমপি তাকে বারবার সতর্ক করার পরেও তিনি তার অভ্যাস ছাড়তে পারেননি।”
বন্ধ মিল-চাতাল সচল দেখিয়ে চাল কেনা
বদরগঞ্জে একসময় ৭০টির বেশি মিল-চাতাল থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশই বন্ধ। অভিযোগ উঠেছে, বন্ধ থাকা ১৮টি মিল-চাতাল ও একটি অটো রাইস মিল সচল দেখিয়ে চলতি বছর বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাল কিনেছেন উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা। খাদ্য অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বন্ধ মিল-চাতালগুলোর বিদ্যুৎ বিলের কপি দেখিয়ে বরাদ্দ অনুমোদন করানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মিল মালিক ও ব্যবসায়ী বাবুল শাহ এবং আজহার মিয়া জানিয়েছেন, তারা এখন আর মিল-চাতালের ব্যবসা করেন না এবং তাদের নামে খাদ্য অফিসে বরাদ্দ আসার কথা শুনলেও কারা চাল সরবরাহ করছেন, তা তারা জানেন না।
লিখিত অভিযোগ ও পোস্টারিং
খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফুড লাইসেন্সে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ আদায়, বাপ্পী সাহার একটি গুদাম থেকে চাল আটকের পর ব্যবস্থা না নেওয়া, ডিলারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে বদরগঞ্জ পৌর শহরে পোস্টারিং করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের তদন্তের আশ্বাস
এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিপ্লব কুমার সিংহ রায় অভিযোগগুলোর জবাব না দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। আমি আর এখানে থাকতে চাই না। আমাকে বদলি করে দিন।” এর বেশি তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালেহ আজিজ জানিয়েছেন, বিপ্লব কুমারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে এবং এর আগে কয়েকটি বিষয়ে তদন্তও হয়েছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জহিরুল ইসলাম বলেন, “ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ একাধিকবার পাওয়া গেছে। আগেও কয়েক দফা তদন্ত হয়েছে। তবে অনেকেই সরাসরি অভিযোগ করতে চান না। প্রয়োজনে আবারও তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


