শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

চীনের শিয়ানে ১২৮৪ বছরের প্রাচীন মসজিদ: দুই সভ্যতার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন

ডেস্ক রিপোর্ট
১ ঘণ্টা আগে
চীনের শিয়ানে ১২৮৪ বছরের প্রাচীন মসজিদ: দুই সভ্যতার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন
চীনের শিয়ানে ১২৮৪ বছরের প্রাচীন মসজিদ: দুই সভ্যতার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

প্রাচীন শিয়ানের গ্রেট মসজিদ: এক ঐতিহাসিক নিদর্শন

চীনের শানসি প্রদেশের রাজধানী শিয়ানে অবস্থিত গ্রেট মসজিদ বা হুয়াজুয়ে লেন মসজিদটি এক হাজার ২৮৪ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রাচীনকালে এই শহরটি চীনের ঐতিহাসিক রাজধানী ছাংআন নামে পরিচিত ছিল এবং সিল্ক রোড বা প্রাচীন রেশমপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে এর বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগ ছিল সুদূরপ্রসারী।

৭৪২ খ্রিস্টাব্দে তাং রাজবংশের শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদটি চীনের বুকে ইসলামের প্রাচীন উপস্থিতি, মুসলিম বণিকদের ভূমিকা এবং স্থানীয় সভ্যতার সঙ্গে ইসলামের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এর স্থাপত্যশৈলীতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত মসজিদের গম্বুজ বা উঁচু মিনারের পরিবর্তে চীনের ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ, উদ্যান ও ধর্মীয় স্থাপনার রীতির সঙ্গে ইসলামি পরিচয়কে একীভূত করা হয়েছে।

চীনে ইসলামের আগমন: ৬৫১ সালের ঐতিহাসিক যোগাযোগ

চীনে ইসলামের আগমনের ইতিহাসে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেসময় চীনে তাং রাজবংশের শাসন চলছিল, আর আরব উপদ্বীপে খলিফা হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর নেতৃত্বে ইসলামের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিস্তার ঘটছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার হানইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হি-সু লি তাঁর ২০০২ সালের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে আরবের শাসক চীনা সম্রাটের দরবারে একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল পাঠান, যা দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রমাণ।

News details square ads

চীনে ইসলামের প্রথম প্রচারক হিসেবে সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নাম প্রচলিত থাকলেও ঐতিহাসিক গবেষণায় এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জেমস ডি ফ্রাঙ্কেলের বিশ্লেষণ এবং ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণা অনুযায়ী, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর চীন সফরের কাহিনি মূলত চীনা মুসলিম ঐতিহ্য ও লোককথায় বিস্তৃত। তাই ৬৫১ সালের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর সফরের প্রচলিত কাহিনিকে দুটি পৃথক ঐতিহাসিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাণিজ্যপথ ধরে ইসলামের বিস্তার

চীনে ইসলাম বিস্তারের ক্ষেত্রে সামরিক অভিযানের চেয়ে বাণিজ্য, অভিবাসন, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকেই আরব ও চীনের মধ্যে সমুদ্রপথে এবং স্থলপথের রেশমপথ ধরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। আরব ও পারস্যের মুসলিম বণিকেরা ভারত মহাসাগর, মালাক্কা প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করে চীনের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াত করতেন।

গুয়াংজু, ছুয়ানচৌ ও অন্যান্য বন্দরনগরীতে মুসলিম বণিকদের বসতি গড়ে ওঠে। তারা ব্যবসার প্রয়োজনে চীনে অবস্থান শুরু করলেও অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈবাহিক ও সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এভাবেই চীনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিস্তার ঘটে। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণাগ্রন্থে তাং রাজবংশের সময় চীনে আরব ও পারস্যের বণিকদের উপস্থিতি এবং তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়।

শিয়ানের মসজিদের স্থাপত্য ও বিশেষত্ব

শিয়ানের গ্রেট মসজিদটির প্রচলিত প্রতিষ্ঠাকাল ৭৪২ খ্রিস্টাব্দ, যা তাং রাজবংশের সম্রাট শুয়ানজংয়ের শাসনামলের সঙ্গে সম্পর্কিত। মসজিদটির চীনা নাম হুয়াজুয়ে শিয়াং ছিংজেন দাসি। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক লরেন্স ই. বাটলারের মতে, যদিও ৭৪২ সালে প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য রয়েছে, তবে এর বর্তমান স্থাপত্যবিন্যাস মূলত মিং ও ছিং রাজবংশের সময়ে একাধিকবার সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফল। ১৯৫৬ সাল থেকে এটি একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত।

স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানে মধ্যপ্রাচ্যের মসজিদের বিশাল গম্বুজ বা উঁচু মিনারের পরিবর্তে চীনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সঙ্গে ইসলামি ধর্মীয় প্রয়োজন ও শিল্পরীতিকে সমন্বয় করা হয়েছে। মসজিদটিতে রয়েছে একাধিক প্রাঙ্গণ, বাগান, অলংকৃত প্রবেশপথ, কাঠের স্থাপনা এবং চীনা প্যাগোডার আদলে নির্মিত মিনার। এর নামাজের স্থান পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ মক্কার কিবলামুখী করে নির্মিত। স্থাপনার বিভিন্ন অংশে আরবি ক্যালিগ্রাফি, কোরআনের আয়াত ও ফুলেল নকশার ব্যবহার দেখা যায়। চীনা স্থাপত্যের কাঠের নির্মাণকৌশল, উঁচু ছাদের কারুকাজ এবং স্থানীয় অলংকরণশৈলীর সঙ্গে ইসলামি ধর্মীয় শিল্পরীতির এই সমন্বয় এটিকে চীনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ইসলামি পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক করে তুলেছে।

চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের সহাবস্থান

শিয়ানের এই মসজিদটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি সংস্কৃতির পারস্পরিক অভিযোজন ও সহাবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইসলাম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তারের সময় স্থানীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চীনের হুই মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারা চীনা ভাষা, সামাজিক রীতিনীতি ও স্থানীয় স্থাপত্যের অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করলেও ইসলামি ধর্মীয় পরিচয় ও অনুশীলন বজায় রেখেছেন।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের মসজিদের স্থাপত্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিফলিত হয়েছে। শিয়ানের গ্রেট মসজিদ এই ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এটি প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত যোগাযোগের সেতুবন্ধ তৈরি হতে পারে।

চীনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ঐতিহাসিক উপস্থিতি

বর্তমান চীনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে হুই ও উইঘুর জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে পরিচিত। এছাড়াও কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক, তাতার, সালার, দংজিয়াংসহ আরও কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলাম প্রচলিত রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীর ভাষা, জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পার্থক্য রয়েছে।

  • হুই মুসলিম: এরা মূলত চীনা ভাষাভাষী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছেন। তাদের ইতিহাস আরব ও পারস্যের বণিকদের আগমন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘকালীন সামাজিক অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
  • উইঘুর মুসলিম: এদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার তুর্কি ভাষাভাষী সমাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে শিনজিয়াং অঞ্চলে তাদের বসতি, ভাষা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে মধ্য এশিয়ার দীর্ঘ ঐতিহাসিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে।

চীনে ইসলামের ইতিহাস তাই কেবল আরব বণিকদের আগমনের ইতিহাস নয়; এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, বাণিজ্যপথ, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ইতিহাস। শিয়ানের প্রায় ১৩ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি এই দীর্ঘ ইতিহাসের এক দৃশ্যমান স্মারক, যা প্রমাণ করে যে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা, নৈতিক আচরণ, সামাজিক আস্থা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]