শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

ভারতে মসজিদ-মাদ্রাসা বুলডোজার অভিযান বন্ধের দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রত্যাখ্যান

ডেস্ক রিপোর্ট
৩ ঘণ্টা আগে
ভারতে মসজিদ-মাদ্রাসা বুলডোজার অভিযান বন্ধের দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রত্যাখ্যান
ভারতে মসজিদ-মাদ্রাসা বুলডোজার অভিযান বন্ধের দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রত্যাখ্যান
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

পটভূমি

ভারতের মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনায় বুলডোজার অভিযান বন্ধ, মাদ্রাসার বিরুদ্ধে হয়রানি ও অপপ্রচার বন্ধ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি) সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের দাবি জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। সংগঠনটির সভাপতি মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানির সভাপতিত্বে হরিয়ানার নুহ জেলার মেওয়াতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরিচালনা পরিষদের সভায় এসব দাবিতে তিনটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। গত ৩০ ও ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি, আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন।

মসজিদ সুরক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়া

মসজিদ রক্ষার প্রশ্নে জমিয়তের প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, মসজিদ কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামষ্টিক পরিচয় এবং সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার বাস্তব প্রকাশ। সংগঠনটির মতে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ, ঈদগাহ, দরগাহ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধ এবং উচ্ছেদ অভিযান উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো স্থাপনা অবৈধ বলে দাবি করা হলেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তা ভেঙে ফেলা যায় না।

  • সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
  • আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে জমিয়ত ১৯৯১ সালের প্লেসেস অব ওয়ারশিপ (স্পেশাল প্রভিশনস) আইনের কঠোর প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট উপাসনালয়গুলোর যে ধর্মীয় চরিত্র ছিল, তা সংরক্ষণ করা এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নতুন বিরোধ সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করা। তবে অযোধ্যার রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিরোধকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

News details square ads

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও বিতর্ক

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৯ সালের অযোধ্যা মামলার রায়ে ১৯৯১ সালের আইনটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের জ্ঞানবাপী মসজিদসংক্রান্ত মামলাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনার বিরোধে আইনটির ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশনা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। আদালত নির্দেশ দেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো মামলা গ্রহণ করে উপাসনালয়ের ধর্মীয় চরিত্র নির্ধারণের জন্য জরিপ বা এ ধরনের কার্যক্রমের নির্দেশ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে চলমান মামলাগুলোতে নতুন করে কার্যকর কোনো নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জমিয়ত কেন্দ্রীয় সরকার ও উচ্চতর বিচার বিভাগের কাছে এই নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

শাহী জামা মসজিদের ঘটনা ও জমিয়তের পদক্ষেপ

প্রস্তাবে উত্তর প্রদেশের সম্ভলের ঐতিহাসিক শাহী জামা মসজিদের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদটির ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে আদালতে মামলা এবং জরিপের নির্দেশের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে সেখানে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে কয়েকজনের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। জমিয়তের মতে, একতরফা জরিপের নির্দেশের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি শান্তি ও আইনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ধরনের বিরোধে আদালত ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে সংগঠনটি মনে করে।

মসজিদের জমির মালিকানা ও স্থাপনার বৈধতা সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়েও জমিয়ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগঠনটির প্রাদেশিক, জেলা ও তহসিল পর্যায়ের শাখাগুলোকে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে একই দিনে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ছয় মাসের মধ্যে মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলোকে জমির খতিয়ান, খসড়া-খতৌনি, পৌরকর পরিশোধের রসিদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাগজপত্র যাচাই ও হালনাগাদ করতে সহায়তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসা প্রসঙ্গে উদ্বেগ ও নির্দেশনা

মাদ্রাসা প্রসঙ্গে গৃহীত প্রস্তাবে স্বীকৃতি ও নিবন্ধনের নামে হয়রানি, ভিত্তিহীন প্রচারণা এবং সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কের মধ্যে টেনে আনার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জমিয়ত কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করে সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে একই সঙ্গে মাদ্রাসা পরিচালকদের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি। জমির দলিল, অনুমোদিত ভবন নকশা, আবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিচয়সংক্রান্ত নথি এবং প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব স্বচ্ছতার সঙ্গে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দাবির পাশাপাশি প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রত্যাখ্যান

সভায় গৃহীত তৃতীয় প্রস্তাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে জমিয়ত। সংগঠনটির ভাষ্য, এ ধরনের আইন স্বভাবগতভাবেই বৈষম্যমূলক। ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক দেশে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রচলিত ব্যক্তিগত আইন রয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে একক আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংগঠনটি মনে করে।

ভারতের সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত; মৌলিক অধিকারের মতো সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য নয়। অন্যদিকে সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ২৬ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় বিষয় পরিচালনার অধিকার স্বীকার করে। ফলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়নের প্রশ্নে সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, লিঙ্গবিচার এবং সাংবিধানিক বহুত্ববাদের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

উপসংহার

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের এই অবস্থানকে শুধু একটি ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন। কারণ, এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে এসেছে—ধর্মীয় উপাসনালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয় সংরক্ষণ, সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক অধিকার এবং ব্যক্তিগত আইনের ভবিষ্যৎ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত আইন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেসব বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

“কোনো স্থাপনা বা প্রতিষ্ঠান আইনবহির্ভূত কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব যথাযথ আইনি কর্তৃপক্ষের; প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প তৈরি করা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”

একইভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানগুলোরও আইনগত নথিপত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জমিয়তের প্রস্তাবে এই দুই দিকের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষার প্রশ্নে আগামী দিনে এসব দাবি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মসজিদ-মাদ্রাসার সুরক্ষা এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্ক তাই কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি ভারতের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]