পটভূমি: এশিয়ার দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা
এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে চীন এবং জাপানের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে একধরনের সুপ্ত ও প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঐতিহাসিক, ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত—বহুমাত্রিক। ঐতিহাসিকভাবে জাপান দীর্ঘকাল এশিয়ার অর্থনৈতিক নেতৃত্বে থাকলেও, বর্তমানে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান জাপানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই প্রতিযোগিতা শুধু দুটি দেশের সীমানা বা বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক রূপরেখা এবং বিশ্বব্যবস্থায় কার প্রভাব বেশি থাকবে, তা নির্ধারণের দীর্ঘমেয়াদি লড়াই।
বাংলাদেশে চীন ও জাপানের প্রভাব
বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে চীন ও জাপান উভয় দেশেরই উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিযোগিতা আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। ভারত, এশিয়ার অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের পুরোনো মিত্র। বাংলাদেশের সমরাস্ত্র খাত অনেকটাই চীননির্ভর, যা চীনকে বাংলাদেশের কৌশলগত মিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে গিয়েছিলেন। জুন মাসের এই সফরে চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই সফরের সময় দুটি বিষয় সবার নজর কেড়েছিল: একটি ছিল চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এবং অন্যটি বাংলাদেশের তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’-এর উন্নয়ন এগিয়ে নিতে চায় চীন। এতে আরও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ যোগ দিয়েছিল, যার লক্ষ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে সংযুক্ত করা।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অংশ। এই করিডোর চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা। তবে, এই করিডোরের সঙ্গে ভূকৌশলগত নানা স্বার্থ জড়িত থাকায় এর বাস্তবায়ন কতটা এগোবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
তিস্তা প্রকল্প: চীনের আগ্রহ ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তা প্রত্যাশা করেন এবং চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এর আগে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং চীনের পানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সফর করে প্রকল্পের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। তবে, নির্বাচনের পর থেকে তিস্তা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ভারত চায় না যে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা থাকুক। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিজস্ব উদ্যোগে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তবে, বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা
চীন সফরের চার মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করেন। এই সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু সহযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ছয়টি সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এই সফরে জাপানের পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হলেও, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন যে, এটি বেসরকারি খাতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত, কোনো সরকারি ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন। এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও সরকারের বিনিয়োগ নীতির ওপর নির্ভরশীল।
মাতারবাড়ী বন্দর ও কৌশলগত গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে, তা হলো মাতারবাড়ী বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণ। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও এর সামগ্রিক উন্নয়নে জাপান গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এটি বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর, যা মূলত জাপান সরকারের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাপান এই বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চায়। অতীতে বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীনও আগ্রহ দেখিয়েছিল (সোনাদিয়ায়), কিন্তু ভারতসহ কয়েকটি দেশের চাপের মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ঋণফাঁদ ও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘ঋণফাঁদ’ বা আক্রমণাত্মক ঋণকৌশলের কথা উঠলে চীনের নাম বেশি আলোচিত হলেও, জাপানও এখন সেই পথে হাঁটছে বলে অনেকে মনে করেন। ছোট দেশগুলোর পক্ষে গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল বা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্প নিজস্ব সক্ষমতায় বাস্তবায়ন করা কঠিন। জাপান প্রথমে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দিলেও, প্রকল্পের আকার ও ব্যয় অনেক বেশি হয়ে যায়। যেমন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ এবং মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোর ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা এর বড় উদাহরণ। প্রকল্প চালুর পর কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল বা রাজস্ব আয় না এলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে চীন, জাপান বা ভারত কোনো দেশের ঋণের সুদের হার আর কম নয়। একসময় জাপান কম সুদে ঋণ দিলেও, নানা কৌশলে জাপানি ঋণের সুদের হার এখন ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশে দাঁড়াচ্ছে।
উপসংহার: অর্থনৈতিক সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই সময়ে যেকোনো ধরনের মেগা প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ট্রানজিট বা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো নয়। একসময় ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর হবে বলে প্রচারণা চালানো হলেও, বাস্তবে অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে এবং ঋণের বোঝা বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চীন, জাপান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশীদার হওয়া বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। ভুল পরিকল্পনা বা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো জাপানি ঋণের জালেও দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে। তাই, চটকদার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে বিপুল ঋণের বোঝা বহন করা থেকে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।


