শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

পেছনের সারির শিক্ষার্থী থেকে ঢাবি-চবিতে প্রথম মুনাদের সাফল্যের গল্প

ডেস্ক রিপোর্ট
৩ ঘণ্টা আগে
পেছনের সারির শিক্ষার্থী থেকে ঢাবি-চবিতে প্রথম মুনাদের সাফল্যের গল্প
পেছনের সারির শিক্ষার্থী থেকে ঢাবি-চবিতে প্রথম মুনাদের সাফল্যের গল্প
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

কলেজে পড়াশোনার সময় পেছনের সারির শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন মেহেরাব হোসাইন মুনাদ। এমনকি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালে কোচিংয়ের মডেল টেস্টেও তার নম্বর আসতো কম। একপর্যায়ে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তবে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও হতাশ না হয়ে হাল ছাড়েননি মুনাদ। ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (সি ইউনিট) মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন।

শুধু সি ইউনিটেই নয়, মুনাদ চবির বি ইউনিটে ৬১৭তম এবং ডি ইউনিটে ১৪১তম স্থান লাভ করেন। এছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৬৭৪তম হয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। নিজের এই ঈর্ষণীয় সাফল্য, প্রস্তুতি কৌশল এবং নতুন ভর্তিচ্ছুদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস নিয়ে সম্প্রতি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন মেহেরাব হোসাইন মুনাদ।

সাফল্যের মুহূর্ত ও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া

নিজের সাফল্যের খবর পাওয়ার মুহূর্তটি বর্ণনা করতে গিয়ে মুনাদ জানান, সেদিন সকাল থেকেই তিনি অধীর আগ্রহে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। পরীক্ষা ভালো হওয়ায় কিছুটা আত্মবিশ্বাস থাকলেও, ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত মনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। বেলা ১১টার দিকে যখন তিনি দেখলেন তার মেধাক্রম ১ম, তখন তিনি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তার মাকে এই খবর জানান, এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদেরও অবহিত করেন।

News details square ads

মুনাদ বলেন, “কলেজে আমি অনেকটা পেছনের সারির স্টুডেন্ট ছিলাম। তাই আমার রেজাল্ট জেনে সবাই একটু চমকে গিয়েছিল। অনেকে হয়তো মনে মনে বলেছে ‘এই ছেলে কীভাবে ভালো রেজাল্ট করলো?’ তবে আমার কাছে ওই মুহূর্তটা শুধু প্রথম হওয়ার আনন্দ ছিল না। ফলাফলটা দেখার পর মনে হচ্ছিল, প্রস্তুতির সময়ের সেই দুশ্চিন্তা, খারাপ মডেল টেস্ট দিয়ে মন খারাপ করা, নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা—সবকিছুর একটা অর্থ খুঁজে পেলাম। আমি মনে করি, সাফল্যের মুহূর্তে মানুষ শুধু নিজের অর্জনটাই দেখে না; সেই অর্জনের পেছনে থাকা কঠিন সময়গুলোও নতুন করে উপলব্ধি করে।”

প্রস্তুতি পরিকল্পনা ও সময় ব্যবস্থাপনা

এইচএসসির আগে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে মুনাদের খুব বেশি ধারণা ছিল না। এইচএসসির পরই তিনি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির বিস্তারিত এবং প্রতিযোগিতার কঠিন দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন। যেহেতু সময় কম ছিল, তিনি বুঝতে পারেন, শুধু অনেক পড়লেই হবে না, বরং অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি নিজের জন্য একটি রুটিন তৈরি করেন এবং পড়াশোনাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন। মুনাদের মতে, পরিকল্পনা শুধু পরিকল্পনাই হয়ে থাকলে চলবে না, সেটিকে প্রতিদিনের কাজে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি পরামর্শ দেন, এমন রুটিন তৈরি করা উচিত যা নিজের বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী নিয়মিত অনুসরণ করা সম্ভব। কত দিন আগে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাপ্ত সময়কে কতটা কাজে লাগানো গেছে।

মুনাদ প্রতিদিন গড়ে কত ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন তার নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। তিনি সকালে উঠে ঠিক করতেন, আজ কোন কোন টপিক শেষ করবেন এবং সেগুলো শেষ করার জন্য পড়াশোনা করতেন। তার কাছে প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়লেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দিনের কাজ কতটুকু শেষ করতে পারলাম। তিনি মনে করতেন, শুধু বইয়ের সামনে অনেকক্ষণ বসে থাকলেই প্রস্তুতি ভালো হবে না, সেই সময়টাতে আসলে কতটুকু শিখতে পারছেন, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, সব বিষয়ে সমান সময় না দিয়ে, যে বিষয়ে তার দুর্বলতা বেশি ছিল, সেটার পেছনে তুলনামূলক বেশি সময় ব্যয় করতেন। তার মতে, যে বিষয়টি পড়তে সবচেয়ে বেশি অনীহা কাজ করে, অনেক সময় নিজের উন্নতির জন্য ঠিক সেই বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি সময় দেওয়া প্রয়োজন।

কঠিনতা মোকাবিলা ও ধারাবাহিকতা

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় মুনাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। প্রতিদিন একই রকম আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব হয় না। কখনো ভালো লাগে, কখনো ক্লান্ত লাগে, কখনো আবার অনেক পড়ার পরও মনে হয় তেমন কিছুই হচ্ছে না। এসব পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যে ধরে রাখাটাই ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন এবং রুটিনের বাইরে খুব বেশি কিছু না করে পড়াশোনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এতে প্রতিদিন কী করতে হবে, সেটা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতো না। মুনাদের মতে, ধারাবাহিকতা মানে প্রতিদিন নিজের সেরাটা দেওয়া নয়; বরং যেদিন নিজের সেরাটা দেওয়া সম্ভব হয় না, সেদিনও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

কার্যকর প্রস্তুতি পদ্ধতি: মডেল টেস্ট বিশ্লেষণ

কোচিংয়ের পাশাপাশি মুনাদ নিজে পড়াশোনার পেছনে অনেক সময় দিয়েছেন। তার কাছে কোচিং ছিল দিকনির্দেশনা পাওয়ার একটি মাধ্যম, কিন্তু নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেগুলো ঠিক করার দায়িত্বটা ছিল নিজের। তার প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে মডেল টেস্টের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করা। প্রতিটি মডেল টেস্টের পর তিনি শুধু নম্বর দেখে থেমে থাকতেন না। কোন প্রশ্নে ভুল হয়েছে, কেন ভুল হয়েছে, বিষয়টি না জানার কারণে ভুল হয়েছে নাকি জানা সত্ত্বেও অসাবধানতার কারণে—এসব বোঝার চেষ্টা করতেন।

মুনাদ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষভাবে বলেন, “মডেল টেস্ট দেওয়ার পর শুধু সঠিক উত্তরগুলো দেখে নিলে হবে না, নিজের ভুলের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ধরো, তুমি একটা পরীক্ষায় ১০টি প্রশ্ন ভুল করলে। পরের পরীক্ষায়ও যদি একই ধরনের ভুল করো, তাহলে শুধু পরীক্ষা দেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু প্রস্তুতির মান হয়তো বাড়ছে না। আমার কাছে মডেল টেস্টের আসল মূল্য ছিল এখানেই যে এটা আমাকে শুধু আমার অবস্থান জানায়নি, বরং কোথায় পরিবর্তন আনতে হবে, সেটাও বুঝতে সাহায্য করেছে।”

সাধারণ জ্ঞান ও পরীক্ষার হলে কৌশল

মুনাদের কাছে সাধারণ জ্ঞান (জিকে) অংশটি তুলনামূলক কঠিন মনে হয়েছিল। তাই এই অংশের জন্য তিনি কয়েকটি বই পড়েছেন এবং যতটা সম্ভব মডেল টেস্ট ও প্রশ্ন সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। জিকে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তার মনে হয়েছে, শুধু তথ্য পড়লেই হবে না। কতটুকু মনে রাখতে পারছেন এবং পরীক্ষার সময় সেগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন কি না, সেটাও যাচাই করা প্রয়োজন।

পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার কৌশল ছিল প্রথমে নিশ্চিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর যেগুলোর উত্তর ভালোভাবে জানতেন, সেগুলো দিয়ে শুরু করেন। কঠিন বা দ্বিধাগ্রস্ত প্রশ্নগুলো প্রথমবারে বাদ দিয়ে সামনে এগিয়ে যান। প্রথম ২৫ মিনিটে সহজ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পর, পরের ২০ মিনিটে দ্বিধাগ্রস্ত প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা করেন। প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রশ্নের উত্তর করার পরও তার হাতে ১৫ মিনিট সময় ছিল, তখন তিনি পুরো প্রশ্নপত্র আরেকবার পড়ে দেখেন।

হতাশা মোকাবিলা ও আত্মবিশ্বাস

প্রস্তুতির সময় মুনাদের মধ্যে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে কোচিংয়ের মডেল টেস্টে নম্বর কম পেলে তিনি খুব হতাশ হয়ে যেতেন। অনেক পড়াশোনা করার পরও যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী নম্বর আসত না, তখন মনে হতো, এত কিছু পড়েও যদি ভালো করতে না পারি, তাহলে ভর্তি পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করব? একসময় নিজের ওপর বিশ্বাসও অনেকটা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

মুনাদ বলেন, “পরে একটা বিষয় উপলব্ধি করি—আমি তখন মডেল টেস্টের নম্বরকে নিজের যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিচ্ছিলাম। অথচ মডেল টেস্টের উদ্দেশ্যই হলো, আসল পরীক্ষার আগে নিজের ভুলগুলো খুঁজে বের করার সুযোগ পাওয়া। তখন নিজেকে বলি, চেষ্টা না করেই যদি হাল ছেড়ে দিই, তাহলে অন্তত নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার সুযোগটুকুও থাকবে না। চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও অন্তত জানতে পারব, আমি কতটা করতে পেরেছি এবং কোথায় আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।”

পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের ভূমিকা

মুনাদের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার মায়ের। প্রস্তুতির সময় যখনই হতাশ হয়েছেন, মা তাকে সাহস দিয়েছেন। যখন নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেননি, তখন মায়ের অনুপ্রেরণা তাকে আবার চেষ্টা করার শক্তি জুগিয়েছে। তার কিছু বন্ধুও তাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করেছে এবং শিক্ষকেরাও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও আইন বিভাগ বেছে নেওয়ার কারণ

আইন নিয়ে পড়ার ইচ্ছা মুনাদের আগে থেকেই ছিল। আইন এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকেই তিনি আইন বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২,৩০০ একরের বিশাল ক্যাম্পাস এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও তাকে মুগ্ধ করেছে।

ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

মুনাদ আগামী বছরের ভর্তি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিকে শুধু পড়াশোনার প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে, এটিকে নিজের উন্নতির একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে। অন্যের অগ্রগতি দেখে নিজের প্রস্তুতি বিচার না করে, প্রতিদিন নিজের কাছে জানতে হবে, আজ কী শিখলাম এবং গতকালের ভুলটা আজ ঠিক করতে পেরেছি কি না।

তিনি তিনটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন:

  1. ধারাবাহিকতা: প্রতিদিন অনেক পড়তে হবে, এমন নয়; কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস ধরে রাখতে হবে।
  2. নির্দিষ্ট রুটিন: নিজের সময় ও সক্ষমতা অনুযায়ী বাস্তবসম্মত রুটিন তৈরি করতে হবে।
  3. ভুল থেকে শেখা: ভুল না করার চেষ্টা করার পাশাপাশি ভুল হলে কেন হলো, সেটা বোঝার মানসিকতা থাকতে হবে এবং একই ভুল বারবার না করে প্রতিবার কিছু না কিছু শিখতে হবে।

সবশেষে মুনাদ বলেন, “নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা করো। অন্য কেউ তোমার চেয়ে এগিয়ে থাকলে হতাশ না হয়ে দেখো, নিজের কোথায় উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। আজকের তুমি যেন গতকালের তোমার চেয়ে একটু ভালো হতে পারো, সেই চেষ্টা করো। কারণ, আমার কাছে সাফল্য শুধু মেধাতালিকায় একটি অবস্থান নয়। সাফল্য হলো, কঠিন সময়েও নিজের লক্ষ্য থেকে পুরোপুরি সরে না যাওয়া, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।”

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]