শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

বিদেশি শ্রমিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনছে সরকার: নিরাপত্তা ও রাজস্ব সুরক্ষাই মূল লক্ষ্য

ডেস্ক রিপোর্ট
৩ ঘণ্টা আগে
বিদেশি শ্রমিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনছে সরকার: নিরাপত্তা ও রাজস্ব সুরক্ষাই মূল লক্ষ্য
বিদেশি শ্রমিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনছে সরকার: নিরাপত্তা ও রাজস্ব সুরক্ষাই মূল লক্ষ্য
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

পটভূমি ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের একটি সমন্বিত রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগসহ একাধিক দপ্তর ইতোমধ্যে এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত প্রতারণা, কর ফাঁকি ও অর্থপাচার রোধ করা।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো লক্ষ্য করেছে যে কিছু বিদেশি নাগরিক স্ক্যামিং, অনলাইন জুয়া এবং সাইবার প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। অনেকে অন-অ্যারাইভাল বা ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে অবৈধভাবে কাজ করছেন, যার ফলে বিপুল অঙ্কের কর ফাঁকি এবং অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কিউআর কোড সংবলিত নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উদ্যোগের সূচনা ও অগ্রগতি

গত ২৯ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ সদর দপ্তরের ত্রৈমাসিক সম্মেলনে বিশেষ শাখার (এসবি) তৎকালীন প্রধান প্রথম এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এসবি, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাজটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

News details square ads

এসবি'র একজন ডিআইজি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “কিউআর কোড সংবলিত রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। এতে বিদেশিদের নিরাপত্তা দেওয়া সহজ হবে এবং কেউ কোনো অপরাধে জড়ালে তাকে সহজে শনাক্ত করা যাবে।”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, “দেশে কর্মরত বিদেশি শ্রমিক ও নাগরিকদের রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা খুবই জরুরি।”

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও বর্তমান পরিস্থিতি

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, ভারত, চীন ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকরা বৈধ-অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চীন ও তাইওয়ানের কয়েকজন নাগরিককে আটক করা হয়, যারা আবাসিক হোটেল ভাড়া নিয়ে সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জুয়ার ব্যবসা চালাচ্ছিল। এই অভিযানে ১,৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং স্টারলিংক ডিভাইসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে ২৮০ জন বিদেশি নাগরিকের তালিকা করে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে পাঠিয়ে তাদের পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

কাজের অনুমতি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশে বিদেশি শ্রমিকদের কাজের অনুমতি প্রদানকারী পাঁচটি কর্তৃপক্ষ ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) মিলে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন দপ্তর গঠন করা হয়েছে, যা বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি প্রদান করে। অন্যান্য কর্তৃপক্ষগুলো হলো:

  • বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা): রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য।
  • এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো: এনজিওতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য।
  • বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ: হাইটেক পার্কের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য।

এছাড়াও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ বিদেশি কর্মীর নিরাপত্তা ছাড়পত্র (সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স) পরিচালনা করে এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ভিসা ও অভিবাসনসংক্রান্ত কাজ করে। বিজনেস ভিসা (বি-ভিসা) ও ট্যুরিস্ট ভিসায় (টি-ভিসা) আসা বিদেশিদের বাংলাদেশে কাজের সুযোগ না থাকলেও অনেকে অবৈধভাবে কাজ করছেন।

বিদেশি নাগরিকদের পরিসংখ্যান ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকের সঠিক ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তার মতে, কিছুদিন আগের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ১ লাখ ৭১৬৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় নাগরিক (৩৭,৪৬৪ জন), এরপর চীনা নাগরিক (১১,৪০৪ জন)।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা জানান, অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় ৪-৫ লাখ বিদেশি বাংলাদেশে আছেন বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা নিছক অনুমাননির্ভর। গত অর্থবছরে বিডা থেকে ১৫,৮৯৮ জন, বেপজা থেকে ১,৮০০-এর বেশি এবং বেজা থেকে ১,৩৫০ জন বিদেশি নাগরিক কাজের অনুমতি নিয়েছেন বা নবায়ন করেছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ২০,৯৮৮ জন।

কর ফাঁকি ও সমন্বয়হীনতা

আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কাজ করলে আয়কর প্রদান ও কাজের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে ২০০৬ সালের ভিসা নীতিমালায় এ-থ্রি ভিসাধারীদের কাজের অনুমতি গ্রহণের শর্ত না থাকায় তারা আয়কর ফাঁকি দিতে সক্ষম হন। কাজের অনুমতিবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থানকারীরা মাত্র ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে পারেন, যা প্রদেয় করের চেয়ে কম হওয়ায় অনুমতি নেওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ কম।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ সীমিত এবং সমন্বয়হীনতার কারণে কাজের অনুমতিবিহীন বিদেশিরা দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি কালো তালিকাভুক্ত বিদেশিরাও নতুন পাসপোর্ট ব্যবহার করে পুনরায় ভিসা নিয়ে দেশে প্রবেশ করছেন।

বিশেষ শাখার প্রধানের মন্তব্য

এসবি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসান বলেন, “ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিদেশি শ্রমিকদের কাজের অনুমোদন দেয়। তারা এ বিষয়ে কাজ করছে। সেখানে রেগুলেশনে কিছু ঘাটতি আছে, সেই ঘাটতিগুলো পূরণে আমরা কাজ করছি। বিদেশিদের রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি অনেক জটিল। এটা চাইলেই হয়ে যাবে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এই উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে বলেন, “অনেক দিন থেকেই এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য রেজিস্ট্রেশন থাকাটা জরুরি। একটি কিউআর কোড সিস্টেম থাকলে সেখানে তার প্রাথমিক বায়োডাটা সংযুক্ত করা যায়। এতে তিনি কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, কোথায় অবস্থান করেন সহজেই তা জানা সম্ভব।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, রেজিস্ট্রেশন থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে এবং অপরাধে জড়িত বিদেশিদের সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থা বিদেশি নাগরিকদের অপরাধ প্রবণতা কমাতেও সাহায্য করবে, কারণ তারা নজরদারির মধ্যে থাকবেন।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]