ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় জনস্বাস্থ্য সেবার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উপজেলায় মোট ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ২৭টি ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ক্লিনিক এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলোকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ভাড়া করা কক্ষে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
ভাড়া করা কক্ষে সেবাদান ও অর্থ সংগ্রহ
ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর বাজার, নাওগাঁও ইউনিয়ন এবং পৌরসভার লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বর্তমানে ভাড়া করা কক্ষে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৪০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন এবং তাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ঘর ভাড়া, আয়ার বেতন, বিদ্যুৎ বিল, খাতা-কলমসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো হচ্ছে। অথচ সরকারি নীতি অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা।
লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের চিত্র
লাহিড়ীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভবনটি ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে এটি দরজা-জানালাবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। এর কার্যক্রম চলছে লাহিড়ীপাড়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসার একটি ছোট কক্ষে, যার মাসিক ভাড়া ৪০০ টাকা। এখানে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীকে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে গাদাগাদি করে বসতে হয়। সেবা নিতে আসা সুমাইয়া আক্তার জানান, রোগীদের কাছ থেকে ঘর ভাড়া, আয়ার বেতন ও বিদ্যুৎ বিলের কথা বলে টাকা নেওয়া হয়।

মহেশপুর বাজার ও নাওগাঁও ক্লিনিকের অবস্থা
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মহেশপুর বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকটিও প্রায় পাঁচ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং মহেশপুর, জয়পুর, উরপা, যমুনারপাড়, বড়ভিটাসহ আশপাশের গ্রামের মানুষকে সেবা দেয়। চার মাস আগে ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে এটি পাশের একটি ঘরের বারান্দায় টিনের ছাপরা তুলে কার্যক্রম চালাচ্ছে, যার মাসিক ভাড়া ৬০০ টাকা। এখানে কর্মরত আয়া হাসিনা খাতুন মাসিক ১ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন এবং তার বেতনসহ অন্যান্য খরচ রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাকা দিয়ে মেটানো হয়। ক্লিনিকটির সিএইচসিপি নাজমুল কবীর জানান, রোগীদের কাছ থেকে ৫ টাকা করে নেওয়া হয়, তবে অনেক রোগী এতে আপত্তি জানান। নাওগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনও গত বছরের নভেম্বরে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে পরিত্যক্ত করা হয়। বর্তমানে এটি মাসিক ১ হাজার ১০০ টাকা ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ঘর ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলের খরচ রোগীদের চাঁদা থেকে মেটানো হয়।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা ও সংস্কারের উদ্যোগ
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফুলবাড়ীয়ার ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২০টি ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও ৭টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব ভবনের দরজা-জানালা ভাঙা, দেয়ালে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়েছে, এমনকি ছাদের ঢালাই উঠে রড বেরিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানিতে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ বন্ধ ছিল।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসানুল হোসাইন বলেছেন, "ফুলবাড়ীয়ায় তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক ভাড়া করা ঘরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সেবা নিতে আসা সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ২ টাকা নেওয়া যেতে পারে। উপজেলার ৫৩টি ক্লিনিকের মধ্যে ২০টির ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাতটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে।"
এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয়দের মাঝে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ এবং রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় বন্ধ করে সরকারিভাবে ক্লিনিক পরিচালনার ব্যয়ভার বহনের দাবি উঠেছে।


