শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

অটিজম: সঠিক পরিচর্যা ও সমর্থনে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব

ডেস্ক রিপোর্ট
২ ঘণ্টা আগে
অটিজম: সঠিক পরিচর্যা ও সমর্থনে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব
অটিজম: সঠিক পরিচর্যা ও সমর্থনে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

পটভূমি: রাহির গল্প

ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু রাহি, যার বয়স যখন দুই বছর, তখন তার বাবা-মা লক্ষ্য করেন যে সে অন্য শিশুদের মতো সাড়া দেয় না। নাম ধরে ডাকলে তাকায় না, চোখের সামনে হাত নাড়লেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না এবং একা একা খেলতে পছন্দ করে। প্রাথমিকভাবে এটিকে স্বাভাবিক বিকাশ মনে হলেও, সময়ের সাথে সাথে রাহির কথা বলতে না পারা এবং বারবার হাত নাড়া বা একই কাজ পুনরাবৃত্তি করার মতো অস্বাভাবিক আচরণ তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে।

তিন বছর বয়সে রাহিকে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর কাছে নেওয়া হলে জানা যায়, সে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত। এই খবর রাহির পরিবারের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তবে মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শে তারা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’-এর সাথে যোগাযোগ করেন।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা ও থেরাপি

রাহিকে স্কুলে ভর্তি করার পর তার জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (Individualized Education Plan—IEP) তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাহি বিভিন্ন থেরাপি গ্রহণ করে:

News details square ads
  • স্পিচ থেরাপি: রাহির যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করার জন্য।
  • অকুপেশনাল থেরাপি: তার সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য।
  • আচরণগত থেরাপি (ABA—Applied Behavior Analysis): পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ কমানো এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া উন্নত করার জন্য।
  • গ্রুপ থেরাপি: অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।

রাহির মা-বাবাও স্কুলের কাউন্সেলিং কর্মসূচিতে অংশ নেন, যেখানে তারা শেখেন কীভাবে রাহির সঙ্গে ধৈর্যশীল ও সহায়ক আচরণ করতে হয়। তারা উপলব্ধি করেন যে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে রাহিও সমাজে অবদান রাখতে পারবে।

অটিজম কী এবং এর লক্ষণসমূহ

অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, যা সাধারণত শিশুদের জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং সীমিত আগ্রহের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে। অটিজম একটি স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, যার লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কিছু ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও অনেকের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।

অটিজমের প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, যেমন—চোখে চোখ না রাখা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা।
  • একই কাজ বারবার করা এবং নির্দিষ্ট বস্তু বা ক্রিয়াকলাপের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ।
  • কথা বলতে দেরি, অস্বাভাবিক সুরে কথা বলা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগে অসুবিধা।
  • নির্দিষ্ট শব্দ, আলো, স্পর্শ বা টেক্সচারের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা উদাসীনতা।

বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন অটিজমে আক্রান্ত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৪৫০ জন।

অটিজমের সম্ভাব্য কারণ ও চিকিৎসা

অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি, তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে:

  • জেনেটিক কারণ: জিনের ত্রুটি বা মিউটেশন অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রেট সিনড্রোম বা ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোমের মতো জেনেটিক ডিসঅর্ডারের সঙ্গে অটিজম যুক্ত হতে পারে।
  • পরিবেশগত কারণ: গর্ভকালীন ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন: জিকা ও রুবেলা), বায়ুদূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক (মার্কারি ও লেড) এবং খাদ্য সংরক্ষণের রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • অন্যান্য কারণ: মা-বাবার বেশি বয়স, গর্ভকালীন জটিলতা এবং মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন বা রাসায়নিক কার্যকলাপ অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।

অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন থেরাপি ও শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের উন্নতি সম্ভব।

সরকারি উদ্যোগ ও মায়ের ভূমিকা

বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে। সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট এ ক্ষেত্রে কাজ করছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক অনুদান প্রদান করে।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বিকাশে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়েরা শিশুর আচরণের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে শিশুকে ভাষা, সামাজিকতা ও দৈনন্দিন কাজ শেখাতে পারেন। ধৈর্য, ভালোবাসা ও সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে মায়েরাই শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন এবং সমাজে অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।

প্রাথমিক শনাক্তকরণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুরা সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]