স্বতন্ত্র ভোটারদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় কারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, তা নির্ধারণে স্বতন্ত্র ভোটাররা এবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। দেশটিতে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া ভোটারের সংখ্যা বর্তমানে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ১১ কোটি ৭০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক নিজেদের স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচয় দেন। এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের সমর্থন পেতে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—দুই প্রধান দলই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে।
তবে, ভোটারদের মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচয়ের এই ব্যাপকতা সত্ত্বেও নির্বাচনে স্বতন্ত্র বা তৃতীয় দলের প্রার্থীদের জয়লাভের ঘটনা খুবই বিরল। কয়েক প্রজন্ম ধরে অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, কংগ্রেস এবং প্রেসিডেন্টের পদে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টিই তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে।
মেইন অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান রিক বেনেট বলেন, “পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থাই ভোটারদের স্বতন্ত্র অবস্থানকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তৈরি।”

বেনেট নিজেও মেইনের গভর্নর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি জয়ী হলে অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে তৃতীয় স্বতন্ত্র গভর্নর হবেন। তার এই প্রার্থিতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে: লাখ লাখ ভোটার ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান পরিচয় প্রত্যাখ্যান করলেও, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দেন তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
স্বতন্ত্র ভোটার কারা এবং তাদের ভোটের প্রবণতা
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বার্ষিক ন্যাশনাল পাবলিক ওপিনিয়ন রেফারেন্স সার্ভে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক নিজেদের রাজনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র মনে করেন। এর বিপরীতে, ২৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন।
তবে, এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিজেদের স্বতন্ত্র বললেও তাদের বেশিরভাগেরই ঝোঁক দুই প্রধান দলের যেকোনো একটির দিকে থাকে। কোনো দলের প্রতি একেবারেই পক্ষপাত নেই—এমন প্রকৃত স্বতন্ত্র ভোটার মোট ভোটারের মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ। নির্বাচনে এই দোদুল্যমান ভোটারদের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ তারা প্রার্থীদের বক্তব্য ও অবস্থানের ভিত্তিতে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। বিভক্ত ও দলীয় মেরুকরণে জর্জরিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তারাই মূলত ‘সুইং ভোট’ হিসেবে বিবেচিত হন।
জরিপ সংস্থা মারিস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন স্বতন্ত্র ভোটারদের ৫২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করছেন, যেখানে রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৩৯ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষও এবারের নির্বাচনি পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে যারা ভোট দিচ্ছেন, তাদের ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার প্রবণতা অন্যদের তুলনায় তিন গুণের বেশি। তাদের ২৮ শতাংশ বলেছেন, তারা পরিবর্তনের জন্য ভোট দিচ্ছেন।
দুই দলের আধিপত্যের কারণ
যুক্তরাষ্ট্রে আইন করে নির্বাচনে দুই দলের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ করা হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জনপ্রতিনিধি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল এবং অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে প্রচলিত পদ্ধতি স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীদের জন্য বাধা তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সাধারণত যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জয়ী হন। কংগ্রেসের প্রতিটি আসনে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ফলে ছোট দলের প্রার্থীরা কোনো আসনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও তা আসন জয়ের জন্য যথেষ্ট হয় না, কারণ তাদের সমর্থন সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় কেন্দ্রীভূত থাকে না। ভোটারদের আচরণও দুই দলের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। জরিপ ও তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পছন্দ করা অনেক ভোটার শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান দলের এমন প্রার্থীকে ভোট দেন, যার জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে তারা মনে করেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রধান বাধা: অর্থায়ন
ভালদোস্তা স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিজ্ঞানী বার্নার্ড তামাস, যিনি তৃতীয় দলের প্রার্থীদের নিয়ে গবেষণা করেন, তার মতে, তৃতীয় দলের প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথে আইনি বাধাকে প্রায়ই দায়ী করা হয়। কিন্তু এসব আইনি বাধা তাদের প্রার্থিতাকে দুর্বল করছে—এমন প্রমাণ খুব কম। তামাসের মতে, প্রকৃত বাধা হলো অর্থ।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেডারেল পর্যায়ের নির্বাচনে মোট ১৪৮০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই ব্যয় ১১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিশাল ব্যয়ের তুলনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা খুব কম অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন, ফলে ভোটারদের কাছেও তারা তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত থাকেন।
- ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনি প্রচারে ডেমোক্রেটিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি প্রায় ২৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে।
- অন্যদিকে, রিপাবলিকান পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পেয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
তামাস আরও উল্লেখ করেন যে, অন্যান্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা বা অর্থায়নের ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। নির্বাচনি প্রচারের ব্যয়ের ওপরও কোনো সীমা নেই।
এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্রদের সম্ভাব্য প্রভাব
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একজন এবং সিনেটে দুজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে স্বতন্ত্র কেউ নেই। রাজনীতিবিজ্ঞানী সিমন্সের হিসাবে, গভর্নর ও সিনেটের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মাত্র ১১ জন স্বতন্ত্র বা তৃতীয় দলের প্রার্থী ৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার সীমা অতিক্রম করতে পারেন। এই সীমা নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।
সিমন্স মনে করেন, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে স্বতন্ত্র কংগ্রেস প্রার্থীরা বিশেষ করে নেব্রাস্কা ও মন্টানার নির্বাচনি হিসাব পাল্টে দিতে পারেন। নেব্রাস্কার স্বতন্ত্র সিনেট প্রার্থী ড্যান অসবর্নকে তিনি দেশজুড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে জয়ের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন। মন্টানাতেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য সুযোগ দেখছেন সিমন্স, তবে সেখানে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সামনে বড় পরীক্ষা হলো একাধিক আসন ও একাধিক নির্বাচনে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সক্ষমতা ধরে রাখা। তবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রভাব সব সময় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অতীতে তারা ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই প্রধান দলকেই নতুন নীতি গ্রহণ করতে বা আরও কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনা করতে চাপ দিয়েছেন।


