শ্রমিকদের লড়াই আমাদের সবারই লড়াই: নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, শ্রমিকের রক্ত ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াই মূলত আমাদের সবারই লড়াই। গত ১ নভেম্বর, ২০২৬ তারিখে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা লেখেন।
শিল্পাঞ্চলে চলমান অস্থিরতা ও শ্রমিকদের দাবি
নাহিদ ইসলাম তার পোস্টে উল্লেখ করেন, গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে উত্তাল। হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক রাজপথে নেমে এসেছেন। তিনি বলেন, দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সেলাই মেশিনের সামনে তীব্র পরিশ্রম করা মানুষগুলো মাস শেষে কেবল একটু মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ চাইছেন, যা কোনো বিলাসিতা বা অপরাধ নয়, বরং তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম হিসাব।
দমনপীড়ন ও দ্বিচারিতার অভিযোগ
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তাদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২,৫০০ টাকা করা হয়েছিল। গত তিন বছরে চাল, ডাল, তেল, ঘরভাড়া ও চিকিৎসাসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে, ফলে এই সামান্য আয়ে পরিবার চালানো শ্রমিকদের জন্য এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

“একই বাজার থেকে কেনাকাটা করা সরকারি কর্মচারীদের বেলায় যা মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের বেলায় তা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে চালিয়ে দেওয়া স্পষ্ট দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, দাবি মানার বদলে আন্দোলনকে রাজনৈতিক চক্রান্ত ও বিরোধীদলের উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করার পুরোনো অপচেষ্টা আবারও দেখা যাচ্ছে। যদি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সেটিকে অজুহাত বানিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের অধিকারকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া সরকারের গোয়েন্দা ও প্রশাসনের ব্যর্থতা প্রকাশ করে।
গণঅভ্যুত্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি
নাহিদ ইসলাম বলেন, যে শ্রমজীবী মানুষ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত ও জীবন দিয়ে পরিবর্তন আনলেন, ক্ষমতার রদবদল হলেও আজ তাদের ওপরেই হাসিনার আমলের মতো দমনপীড়নের সুর ও ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ও বিজিবির লাঠিচার্জে ইতোমধ্যে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন, এমনকি সংবাদকর্মী ও সাধারণ পথচারীরাও এই হামলা থেকে রেহাই পাননি।
তিনি শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার এবং সহকর্মীর আটকের প্রতিবাদে ফেসবুকে মতামত প্রকাশের জেরে সাধারণ শ্রমিককে গ্রেফতার করার ঘটনাকে বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের চরম পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। যে রাষ্ট্র শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে রাজপথে বিজিবি নামায়, সে রাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়ায় তা স্পষ্ট বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মজুরি বোর্ড ও মালিকপক্ষের দায়বদ্ধতা
তীব্র চাপের মুখে সরকার সম্প্রতি যে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তাকে আন্দোলন থামানোর কৌশল মাত্র বলে অভিহিত করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এটি কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস নয়। ২০২৩ সালেও ২৫ হাজার টাকার দাবির বিপরীতে বোর্ডের নামে সময়ক্ষেপণ করে শেষ পর্যন্ত নামমাত্র ১২,৫০০ টাকা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া, এই বোর্ডে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে, যা বোর্ডের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে।
মালিকপক্ষ বৈশ্বিক মন্দা বা কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কথা বললেও, ভালো সময়ের মুনাফা একা ভোগ করে সংকটের সমস্ত বোঝা শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না বলে তিনি মনে করেন। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য আদায় করা এবং মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সরকারের মূল দায়িত্ব।
সরকারের প্রতি আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের ঘাম থেকে। তাদের পরিশ্রমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও মাস শেষে তাদের নিজেদের ঘরেই হাড়ি জ্বলে না, যা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। তিনি অবিলম্বে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করার আহ্বান জানান:
- গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি
- পুলিশি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত
- শ্রমিক ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তকরণ বন্ধ
- নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিতকরণ


