তাহসিফ সাউরি বিতর্কে নতুন মোড়
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে চাকরিচ্যুতি এবং প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের আগস্টে 'আমার দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং 'নব্য বিএনপি'র একটি অংশ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে 'আমার দেশ' ও তার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে।
সজীব ওয়াজেদ জয় ও 'নব্য বিএনপি'র অভিযোগ
সজীব ওয়াজেদ জয় গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে 'আমার দেশ' ও মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন। প্রায় একই সুরে, 'নব্য বিএনপি'র অংশ হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী রাশেদ খান (যিনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন) এবং আমজনতা পার্টির তারেক রহমান (যিনি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরসঙ্গী ছিলেন) ফেসবুক স্ট্যাটাস ও গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেছেন যে, 'আমার দেশ'-এর রিপোর্ট প্রকাশের জেরেই তাহসিফকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
'আমার দেশ' এর পাল্টা দাবি ও তথ্যগত অসঙ্গতি
'আমার দেশ' এই অভিযোগকে 'ডাহা মিথ্যা' বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, তাহসিফের চাকরি চলে যাওয়ার তিন মাস পর ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর 'আমার দেশ' পুনঃপ্রকাশিত হয়। যে রিপোর্টটি নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে, সেটি প্রকাশিত হয়েছে তাহসিফের চাকরি যাওয়ার প্রায় এক বছর পর। তাহসিফের বাবাও জানিয়েছিলেন যে, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাহসিফকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিমান বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

এছাড়াও, তাহসিফ নিজেই গত জুলাইয়ে একটি পডকাস্টে (যার খণ্ডিত অংশ 'আমার দেশ'-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে) বলেছেন যে, চাকরিচ্যুতির সময় কেড়ে নেওয়া তার পাসপোর্টটি প্রায় দুই বছর পর তিনি ফিরে পেয়েছেন। 'আমার দেশ' আরও স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রকাশিত রিপোর্টে তাহসিফকে 'র'-এর এজেন্ট বলা হয়নি। বরং শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও তোলা ও প্রচারের অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে 'র'-এর এজেন্টদের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ভিডিও প্রচারে তাহসিফের নাম উঠে আসে।
ভিডিও প্রচার ও 'র' নেটওয়ার্কের অনুসন্ধান
'আমার দেশ' এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিওটি তাহসিফ করেননি; এটি ধারণ করেছিলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। রিফাত আশরাফী নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি তার অফিসের রুমের জানালা থেকে ওই ভিডিও ধারণ করেন। 'আমার দেশ' এর রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, তাহসিফ ওই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছেন। পডকাস্টে তাহসিফ এই বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার বা স্বীকার করেননি।
পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, তাদের মূল রিপোর্টটি ছিল বাংলাদেশের বিমান বাহিনীতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর নেটওয়ার্ক নিয়ে। ভিডিওটি যাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেই সূত্র ধরে যাদের নাম এসেছে, তাদের আগেই কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি করা হয়। শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। 'আমার দেশ' দাবি করেছে, এই ঘটনায় 'র'-এর সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে যখন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে সাজাপ্রাপ্তদের একজনের কাছে এমন তিনটি অস্ত্র পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশের কোনো বাহিনী ব্যবহার করে না, বরং ভারতের প্যারা কমান্ডোরা ব্যবহার করে।
মাহমুদুর রহমানের নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
সজীব ওয়াজেদ জয় তার পোস্টে মাহমুদুর রহমানকে তুরস্কের নাগরিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তার জবাবদিহিতা দাবি করেছেন। 'আমার দেশ' এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বৈত নাগরিক এবং তিনি নিজেই বিভিন্ন লেখায় ও টকশোতে এই তথ্য উল্লেখ করেছেন। তুরস্ক থেকে নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি তুরস্কের পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন এবং বিদেশ ভ্রমণেও এই পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। 'আমার দেশ' এই প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয় (মার্কিন নাগরিক) এবং বিএনপির অনেক মন্ত্রী-এমপি ও তাদের পরিবারের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি তুলে ধরেছে।
'আমার দেশ' অভিযোগ করেছে যে, সজীব ওয়াজেদ জয়, রাশেদ খান এবং আমজনতা দলের তারেকসহ কিছু লোক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মতে, এই মিথ্যাচারের মূল উদ্দেশ্য হলো তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে বিদেশি আগ্রাসী শক্তির অপরাধ আড়াল করা এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। তারা প্রশ্ন তুলেছে, বিএনপিতে অনুপ্রবেশকারী গুপ্ত ফ্যাসিস্টরা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন কিনা।
জুলাই বিপ্লবে মাহমুদুর রহমানের ভূমিকা
আমজনতা দলের তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনের পক্ষে মাহমুদুর রহমান কোনো বিবৃতি দেননি। এই অভিযোগের জবাবে 'আমার দেশ' উল্লেখ করেছে যে, ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা'-তে জনগণকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানোর জন্য বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে মাত্র দুইজনের বক্তব্য প্রচারিত হয়েছিল। একজন ছিলেন লন্ডন থেকে দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্যজন তুরস্ক থেকে 'আমার দেশ' সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এই তথ্য মাহমুদুর রহমানের ফ্যাসিবাদবিরোধী ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সবশেষে, 'আমার দেশ' দাবি করেছে যে, তাহসিফের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে যারা তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং বিদেশি আগ্রাসী শক্তির অপরাধ আড়াল করা। তারা সবাইকে বিশেষ উদ্দেশ্যে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।


