ভূমিকা
মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে। তবে তার দেশে ফেরার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নাশকতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরির অপচেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপতৎপরতা ও অভিযোগ
পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও শ্রমিক অসন্তোষে 'ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর' জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে দলটির বেশ কিছু নেতাকর্মীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী হাসিনার কথিত 'ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা'কে ঘিরে দেশ-বিদেশে তার দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন অপতৎপরতা শুরু করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নাশকতা ও চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গোপন লবিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানানোর প্রয়াস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃতপক্ষে হাসিনা দেশে ফিরবেন না। জুলাই বিপ্লবের পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া নেতাকর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনা, ঝিমিয়ে পড়াদের চাঙ্গা রাখা এবং দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগের অবস্থান জানানোর উদ্দেশ্যেই এ ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাদের ধারণা, ডিসেম্বর মাস পেরিয়ে গেলে কর্মীদের মাঠে ধরে রাখতে নতুন কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
বিগত দেড় দশকের গুম-হত্যা, ভোটাধিকার হরণ, আর্থিক খাতের লুটপাট, আয়নাঘরের নির্যাতন এবং জুলাই বিপ্লবের সময় ১৪০০ মানুষকে হত্যার দায় নিয়ে হাসিনার দেশে ফেরার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি; তীব্র ঘৃণা ও ঐতিহাসিক গণধিক্কারের কারণে রাজনৈতিকভাবে তার ফেরার পথ চিরতরে অবরুদ্ধ।
আইনি ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট
ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। পলাতক অবস্থাতেই জুলাই গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। আদালতের আদেশের পর গত বছরের ২১ নভেম্বর প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে কূটনৈতিক পত্র দেয় বাংলাদেশ। ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনি উল্লেখ করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
দুই দেশের চিঠি চালাচালির মধ্যেই প্রথমে ভারতের একটি গণমাধ্যমে এবং পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণার পরপরই দেশ-বিদেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অপতৎপরতা শুরু হয়।
গুজব ও অপপ্রচার
ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যমসহ আওয়ামী বয়ান তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক ইউটিউব চ্যানেলে টকশো, পডকাস্টসহ নানাভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিদেশে পলাতক নেতারা হাসিনার সঙ্গে ৪০টি বিমান বা হেলিকপ্টারে ঢাকায় আসার ঘোষণা দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও কট্টর সমর্থকরা এও বলতে শুরু করেছেন যে, হাসিনা দেশে ফিরে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। ব্যাপক হারে গুজব ছড়ানো ও ফেক নিউজ প্রচারের ঘটনাও ঘটছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার দূরত্ব বৃদ্ধির সুযোগে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে তারা। চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার তৈরি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমকে বলেন, “তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত পোশাক শ্রমিকদের কিংবা ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং শিল্প খাত ধ্বংস করতে সুযোগ সন্ধানী ও ফ্যাসিস্টের সমর্থকরা মুখে মাস্ক পরে আন্দোলনস্থলে অনুপ্রবেশ করেছেন। তারা ভুয়া স্লোগান দিয়ে সহিংসতা ছড়াচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী এর সঙ্গে জড়িত বলেও তিনি অভিযোগ করেন।”
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, “ডিসেম্বরে হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তার গলায় মালা যাওয়ার আগেই আইনের হ্যান্ডকাফ হাতে পৌঁছে যাবে।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, “কে কখন আসতে চায় বা না চায়, এটা নিয়ে সরকার মোটেও বিচলিত নয়। সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। যে যখনই আসুক, তাদের আইনানুযায়ী হেফাজতে নেওয়া হবে।”
তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, “উনি ঘোষণা দিয়েছেন, উনি আসবেন কি আসবেন না, এটা সময় বলে দেবে। তবে আমি মনে করি, ওই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়নি। কারণ, চব্বিশের হত্যা ও অত্যাচারের ট্রমা থেকে দেশের মানুষ এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি।” প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, “হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে কোনো মবের মুখোমুখি হতে হবে না। তাকে ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।”
হাসিনার নিজের বক্তব্য
দেশে ফেরার প্রস্তুতি প্রশ্নে সম্প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশি এক সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, তার পাসপোর্ট ও আইডি কার্ড বন্ধ থাকায় টিকিট করা যায় না। তবে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন এবং যেভাবে হোক যাওয়ার একটি ব্যবস্থা করবেন। ট্রাভেল পাস চাওয়ার জন্য পাঁচ সদস্যের বিদেশি আইনজীবী প্যানেল প্রস্তুত করার খবরটি সত্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে হাসিনা সম্প্রতি অনলাইনে যুক্ত হয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান এবং আঘাত এলে পাল্টা আঘাতের নির্দেশ দেন। এ সময় সাবেক এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ভোলা থেকে তিন-চার লাখ লোক নিয়ে ঢাকায় জড়ো হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে হাসিনা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “এত লম্বা লম্বা কথা বলো, আওয়ামী লীগ অফিসটা তো এখনো উদ্ধার করতে পারোনি। এক-দেড়শ লোক নিয়ে গেলে কি তোমাদের মেরেকেটে শেষে করে দেবে? আবার বলছ লাখ লাখ লোক আনবে। বাস্তবসম্মত কথা বলবা।”
বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক মনে করেন, জুলাইয়ের রক্তপাত এবং হাসিনার শাসনামল নিয়ে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ ও আদালতের দণ্ডের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেশে ফিরে স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন। তার দেশে ফেরার এ ঘোষণা মূলত রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় থাকা এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি কৌশল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, হাসিনার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণাকে শুধু 'ঘোষণা' হিসেবেই মনে করার সুযোগ রয়েছে। তবে তার ঘোষণার পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেশ-বিদেশে যেসব পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশে ফিরলে যে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেটাও ভাবনার বিষয়।
জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী দেশে অস্থিরতা তৈরির সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।


