চীনের বাজারে বাংলাদেশের জন্য ছয় বিশেষ সুবিধা
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও প্রসারিত করতে এবং চীনের বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে দেশীয় পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরতে চীন সরকার বাংলাদেশকে ছয়টি বিশেষ সুবিধা প্রদান করতে যাচ্ছে। এই সুবিধাগুলো দু'দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
‘থ্রি ফ্রি’ নীতির আওতায় প্রাপ্ত সুবিধা
চীনের ‘থ্রি ফ্রি’ নীতির অধীনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন। সম্প্রতি চীনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সরকারের অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কাজ করছে।
- বিনামূল্যে ওয়্যারহাউস সুবিধা: ইউনান প্রদেশে ২,০০০ বর্গমিটারের একটি ওয়্যারহাউস বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। এর ফলে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য সরবরাহ দ্রুত হবে এবং উদ্যোক্তাদের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
- বিনামূল্যে অফলাইন প্রদর্শনী হল: আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে চীন ২,০০০ বর্গমিটারের একটি অফলাইন প্রদর্শনী হল বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এটি বৈদেশিক বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্যের সুযোগ বৃদ্ধি এবং ক্রয়াদেশ বাড়াতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্জন, সম্পদের সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে বিশ্ববাসী আরও ভালোভাবে জানতে পারবে।
- অনলাইন কমোডিটি মলে প্রবেশাধিকার: বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা চীনের অনলাইন কমোডিটি মলে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন পণ্য বিশ্বজুড়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরা যাবে, যা নতুন বাজার তৈরি এবং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড ইমেজ গঠনে সহায়ক হবে।
‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ নীতির অধীনে সহায়তা
‘থ্রি ফেসিলিটেশন’ নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি সহজ করতে তিন ধরনের বিশেষ লজিস্টিক সহায়তা পাবে বাংলাদেশ।

- লজিস্টিকস ও পরিবহন ফি মওকুফ: বাংলাদেশের এসএমই এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চীনের বাজারে প্রবেশ সহজ করতে নির্দিষ্ট লজিস্টিকস ও পরিবহন ফি মওকুফের সুবিধা দেওয়া হবে।
- দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স: বাংলাদেশের শাকসবজি, ফলমূলসহ পচনশীল কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য দ্রুত চীনের বাজারে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কাস্টমস ছাড় ও দ্রুত ক্লিয়ারেন্সের সুবিধা পাওয়া যাবে। এটি দেশের কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
- ‘লানছাং-মেকং এক্সপ্রেস+’ ট্রেনে অগ্রাধিকার: অংশীদার দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মালবাহী ট্রেন ‘লানছাং-মেকং এক্সপ্রেস+’-এর মাধ্যমে পরিবহনে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেওয়া হবে। এর ফলে বাণিজ্য প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতা কার্যকরভাবে কমে আসবে, ব্যবসা আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল হবে এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর লজিস্টিকস ব্যয় হ্রাস পাবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন বলেন, “এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নিলে দেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও হস্তশিল্পের রপ্তানি বহুগুণ বাড়বে। একইসঙ্গে এই যুগান্তকারী লজিস্টিক ও নীতিগত সহায়তা কার্যকর হলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি পর্যায়ক্রমে একটি টেকসই ও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।”
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মতো বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের এমন শুল্কমুক্ত ও সহজ প্রবেশাধিকার দেশের রপ্তানি ঝুড়িকে বহুমুখী করার এক বিশাল সুযোগ।
বিসিসিসিআই-এর প্রস্তাবনা ও অগ্রগতি
গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশের ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য ছয়টি দাবি তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা খোলা, চীনা বিনিয়োগে ম্যানমেইড ফাইবারের (এমএমএফ) কারখানা স্থাপন, পুঁজিবাজারে চীনের বিনিয়োগ, ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ, চীনে রপ্তানি বাড়াতে বিনামূল্যে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও গুদাম স্থাপন এবং চীনের উদ্যোগে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা।
বিসিসিসিআই সভাপতি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খোরশেদ আলম জানান, “আমরা গত বছরের অক্টোবরে ছয়টি প্রস্তাব বা দাবি জানিয়েছিলাম চীনের কাছে। সম্প্রতি এসব উদ্যোগ নিয়ে কাজ এগিয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি সহজীকরণ, প্রদর্শনী ও পণ্য উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি এবং পলিটেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়ও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইপিবি কাজ করছে এবং চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বিনা ভাড়ায় এই জায়গা পাওয়া গেলে বাংলাদেশের জন্য তা বড় একটি সুযোগ হবে, যেখানে বাংলাদেশি ও চীনা কর্মী রেখে পণ্য প্রদর্শন, বিক্রি এবং বাজারের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বিসিসিসিআই-এর লক্ষ্য এই উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করা। তবে এর জন্য উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন, বাজার যাচাই এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


