অর্থনৈতিক বাস্তবতার উপলব্ধি
সম্প্রতি দেশের অর্থনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী এবং উপদেষ্টার পক্ষ থেকে যে আশঙ্কার কথা শোনা গেছে, তা দেশের জন্য একটি ইতিবাচক লক্ষণ। 'পপুলিস্ট' কথাবার্তা পরিহার করে সরকারের কঠিন বাস্তবতা অনুধাবন করা জরুরি। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি জনগণকে বুঝিয়েছিল যে, নির্বাচনই দেশের সকল সমস্যার রাতারাতি সমাধান আনবে। জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির প্রথম জনসভাতেই তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের দাবি তোলা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা ও বিতর্ক
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমে আমার ব্যক্তিগতভাবে কখনো এমনটা মনে হয়নি যে তারা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য খলিলুর রহমান (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী), আসিফ নজরুল, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং আদিলুর রহমান খান-এর সঙ্গে আমার নিয়মিত আলোচনা হতো। আমি তাদের পরামর্শ দিতাম, যদি সরকার সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব না হয়, তবে দ্রুত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও আমার এই অবস্থান সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আমার দেশ পত্রিকায় প্রফেসর ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে একাধিকবার 'Either Rule or Quit' জাতীয় মন্তব্য প্রতিবেদনও লিখেছিলাম।
বিএনপির ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার আগে, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের বিশেষ অনুরোধে বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। র্যাডিসন হোটেলে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, প্রফেসর ইউনূসকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে হয় নির্বাচন দিতে হবে, নতুবা পদত্যাগ করে চলে যেতে হবে। আমার এই বক্তব্যে বিএনপির উপস্থিত নীতিনির্ধারকরা বিস্মিত ও আনন্দিত হয়েছিলেন। কবি ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার রাষ্ট্র সংস্কারের আগে নির্বাচন দেওয়ার বিপক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার স্পষ্ট ও ইতিবাচক অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।

পূর্ববর্তী সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা
শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অপচয় ও লুটপাট হয়েছে। মেগা প্রজেক্টের নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় করা হয়েছে, যা দেশের প্রকৃত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে রিজার্ভের অর্থ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের নামে তছরুপ করা হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পে বিলিয়ন ডলারের অপচয় হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়নে নেমে আসে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ঋণখেলাপি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
ব্যাংকিং খাতের সংকট ও অন্তর্বর্তী সরকারের পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েক ডজন সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হওয়ায় দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। প্রফেসর ইউনূস ও তার 'ইকোনমিক টিম' এই ভঙ্গুর অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রশংসনীয় দ্রুততার সঙ্গে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তাদের প্রচেষ্টায় মাত্র দেড় বছরের মধ্যে রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন থেকে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল, 'ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার'। ইশতেহার অনুযায়ী, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য উপরে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আগামী ৮ বছরে জিডিপি দ্বিগুণ করতে হবে, যার অর্থ প্রতিবছর জিডিপিকে ১৯ বিলিয়ন থেকে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার করে বাড়াতে হবে। এটি গত ১০ বছরের গড় বৃদ্ধির তিনগুণ। ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি লক্ষ্যমাত্রার অর্থ হলো, ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঊর্ধ্বে ধরে রাখা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো অর্জিত হয়নি।
বর্তমান অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও চ্যালেঞ্জ
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে যথাক্রমে মাত্র ৩.২, ৩.৪ এবং ৪ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন আকাশকুসুম কল্পনার মতো অবাস্তব মনে হচ্ছে। বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনই উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতে দীর্ঘকাল ধরে কোনো সুখবর নেই। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শিল্প খাতে জিডিপি বাড়ার পরিবর্তে সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বিগত তিন মাসে শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আমদানি এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে।
সম্পদ বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচন
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়ের মধ্যে শিল্প খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কৃষিতেও অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ সীমিত। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও তার জন্য সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টাও একই কথা বলেছেন। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ডের সুফল দ্রুততার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। সরকারের উচিত অপচয়মূলক ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বন্ধ করে আগামী এক বছর দারিদ্র্য বিমোচন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা।


