সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পরিচালিত জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর কার্যক্রম বন্ধ বা গুটিয়ে নেওয়ার (উইন্ড-ডাউন) প্রক্রিয়া শুরু করেছে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই)। এই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ইউএই অপারেশনের এমন সংকট থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নির্ধারণে এবার ঢাকা ও আবুধাবির নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে একটি জরুরি উচ্চপর্যায়ের সভা আয়োজনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মুহঃ ফজলুর রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই জরুরি তাগিদ দিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইউএই এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্রুত দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় জোরদার করা না গেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ প্রবাসীর রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে, এই শাখাটি বন্ধ হয়ে গেলে তা বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহঃ ফজলুর রহমান বলেন, "বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ব্যাংকের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে একটি সভা আয়োজনের দাবি জানিয়েছি।"
মূলধন ঘাটতি ও প্রশাসক নিয়োগ
ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার পর জনতা ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে মূলধন ঘাটতি পূরণের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন সাপেক্ষে গত ৮ সেপ্টেম্বর ৩০০ মিলিয়ন ইউএই দিরহাম সমপরিমাণ ৮ কোটি ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ১০৩ মার্কিন ডলার আবুধাবি শাখায় পাঠানো হয়। একই সঙ্গে, গত ২২ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে সিবিইউএই-এর গভর্নর বরাবর জনতা ব্যাংকের মূলধন পর্যায়ক্রমে ২ বিলিয়ন বা সমপরিমাণে উন্নীত করার একটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতিপত্র পাঠানো হয়।
তবে এতসব পদক্ষেপের পরও গত ১ অক্টোবর সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইউএই এক চিঠির মাধ্যমে ক্রো ইউএই-কে জনতা ব্যাংকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তারা গত ৮ অক্টোবর থেকে ইউএই অপারেশনে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।
১০ লাখ প্রবাসীর ব্যাংকিং সেবা ঝুঁকিতে
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৭৪ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে জনতা ব্যাংক। বর্তমানে এই বৈদেশিক শাখাসমূহে প্রায় ৭০ হাজার সক্রিয় আমানত হিসাবধারী এবং ৩,৪০০ ঋণ ও অগ্রিম সুবিধাভোগী গ্রাহক রয়েছেন, যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। ফলে এই শাখাগুলোর কার্যক্রম কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আমানত ও সামগ্রিক ব্যাংকিং সেবা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভার তাগিদ
এমন কঠিন সংকট থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির অবসান এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা ডাকার তাগিদ দিয়েছে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনতা ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের সমন্বয়ে জরুরি ভিত্তিতে একটি ভিডিও কনফারেন্স বা সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সভা আয়োজন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান।
মূলধন ঘাটতির পটভূমি
জানা গেছে, ২০২১ সালে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম মূলধনের শর্ত ৪০ মিলিয়ন দিরহাম থেকে বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম করে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ইউএই ইউনিটের পরিশোধিত মূলধন ছিল ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। এর সঙ্গে ৮৩ মিলিয়ন দিরহাম অবণ্টিত মুনাফা থাকলেও নতুন নির্ধারিত সীমার তুলনায় বড় ঘাটতি থেকে যায়।
এই ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুলাই ২০২৬ থেকে জনতা ব্যাংকের ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত রিজার্ভ হিসাব থেকে ডেবিট লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর এক সপ্তাহ পর, ১৫ জুলাই, ব্যাংকটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তিন বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় ইউএইর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।


