শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

মসলা উৎপাদনে উদ্যোগ সত্ত্বেও কমছে না আমদানিনির্ভরতা: বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়

ডেস্ক রিপোর্ট
২ ঘণ্টা আগে
মসলা উৎপাদনে উদ্যোগ সত্ত্বেও কমছে না আমদানিনির্ভরতা: বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়
মসলা উৎপাদনে উদ্যোগ সত্ত্বেও কমছে না আমদানিনির্ভরতা: বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

ভূমিকা: মসলা উৎপাদনে চ্যালেঞ্জ ও আমদানিনির্ভরতা

বাংলাদেশে মসলার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং কালোজিরাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মসলার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি জিরা চাষেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের মসলা আমদানিনির্ভরতা এখনো কমছে না, যার ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।

বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মসলা আমদানিতে রাষ্ট্রের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই অর্থবছরে মসলা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৫৬.৪ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে মসলা খাতে রপ্তানির তুলনায় আমদানির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০৫ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

উৎপাদন বৃদ্ধি: একটি আশার আলো

মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান, আমার দেশকে জানান যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি মসলার উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

News details square ads
  • আদা: ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২.৪৭ লাখ টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২.৫১ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
  • পেঁয়াজ: একই সময়ে ৩৪.৫৬ লাখ টন থেকে রেকর্ড ৫০.৯১ লাখ টনে পৌঁছেছে।
  • রসুন: ৬.৪১ লাখ টন থেকে বেড়ে ৮.৪৮ লাখ টন হয়েছে।
  • হলুদ: ১.৫৮ লাখ টন থেকে সামান্য বেড়ে ১.৫৯ লাখ টন হয়েছে।
  • কালোজিরা: ০.১২ লাখ টন থেকে বেড়ে ০.১৩ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।

উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্ব

কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই মসলা খাতের উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট নয়। ফসল তোলার পর সঠিক শুকানো, বাছাই, গ্রেডিং, সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে পণ্যের মান কমে যায় এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন:

  • ফসলভিত্তিক চাহিদা, উৎপাদন ঘাটতি, আমদানির পরিমাণ এবং আঞ্চলিক কৃষি-উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ।
  • মানসম্মত বীজ ও রোপণ উপকরণের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনের প্রশিক্ষণ প্রদান।
  • উৎপাদন এলাকায় সংরক্ষণাগার, শুকানোর সুবিধা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলা।
  • কৃষক সংগঠন ও উৎপাদক দলকে শক্তিশালী করে কৃষক, পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধি।

বিদেশি জিরার মাঠে দেশীয় সাফল্য

বিশ্বের ১০৯ প্রকার মসলার মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে জিরা, এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ মূলত আমদানি করা হতো। তবে, এই চিত্র পরিবর্তনে সরকার ‘বারি জিরা-১’ মাঠপর্যায়ে চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০টি জেলায় জিরার প্রদর্শনী স্থাপন করে প্রাথমিক সফলতা আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়। সাফল্য অব্যাহত থাকায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩০ কৃষককে প্রশিক্ষণ ও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, যা দেশে জিরা উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সুপারিশ

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আমার দেশকে বলেন,

“পেঁয়াজের উৎপাদন বর্তমানে বেড়েছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এবং আগামী ২-৪ বছর উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত রাখা গেলে পেঁয়াজ আমদানির আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রসুনের উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব এবং পাহাড়ি অঞ্চলে আদা ও অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসলের চাষ বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মসলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি:

  • গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
  • গবেষণায় উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
  • প্রকল্পের অর্জন মূল্যায়নে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, ফলন, বাজারদর এবং আমদানি প্রতিস্থাপনের পরিমাণ নির্ধারণ করা।
  • মানসম্মত বীজ সরবরাহ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো।
  • সরাসরি ‘কৃষক থেকে ক্রেতা’ বাজার সংযোগ স্থাপন করা।

২০২২ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়নাধীন মসলা উৎপাদন প্রকল্পের কার্যকারিতা বিচারে এর ২য় সংশোধনীতে সময় ও বরাদ্দ বাড়িয়ে চলমান ধারা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বর্তমান পর্যায়ে প্রকল্প সহায়তা, চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং ভর্তুকি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]