শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

সীতাকুণ্ড হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা: সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি চরমে

ডেস্ক রিপোর্ট
২ ঘণ্টা আগে
সীতাকুণ্ড হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা: সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি চরমে
সীতাকুণ্ড হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা: সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি চরমে
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বর্তমানে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টনে তীব্র অসংগতি, প্রশাসনিক তদারকির অভাব এবং নির্দেশিত সেন্ট্রাল রোস্টার অমান্য করে দ্বৈত নীতি অনুসরণের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে উপজেলার দূরদূরান্ত থেকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাজারো অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

দায়িত্ব বণ্টনে বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্য

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টনে সমন্বয় আনা এবং হাসপাতালে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্স সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তনয় মজুমদারকে একটি সমন্বিত সেন্ট্রাল রোস্টার তৈরির নির্দেশ দেন। তবে সেই আদেশ অমান্য করে পুরুষ ও নারী চিকিৎসকদের জন্য পৃথক রোস্টার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে হাসপাতালের বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের দায়িত্বসূচিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

  • কিছু চিকিৎসককে সপ্তাহে টানা ছয় দিন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
  • প্রভাবশালী একটি পক্ষ মাত্র দুই থেকে তিন দিন ডিউটি করার সুবিধা পাচ্ছেন।
  • পুরুষ চিকিৎসকদের দৈনিক ১৪ ঘণ্টা এবং নারী চিকিৎসকদের ১০ ঘণ্টা করে ডিউটিতে বাধ্য করার অনিয়ম বিদ্যমান।

বায়োমেট্রিক হাজিরা ও চিকিৎসকদের অনিয়ম

হাসপাতালের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার ডিজিটাল (বায়োমেট্রিক) হাজিরা যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। এই সুযোগে কিছু চিকিৎসক নির্ধারিত সকাল ৯টার পরিবর্তে ১০টা বা তারও পরে কর্মস্থলে আসেন এবং নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার অনেক আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ডিউটি চলাকালে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশকে জরুরি বিভাগে না থেকে নিজ কক্ষে বিশ্রামে কাটাতে দেখা যায়, যা সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

News details square ads

ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় ঝুঁকি

ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত আরএমও নিজে নিয়মিত ওয়ার্ড রাউন্ড না দিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসককে পাঠাচ্ছেন। এর ফলে রোগীদের পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং পরবর্তী চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে, যা রোগীদের সুস্থতার পথে বড় বাধা।

অবকাঠামোগত বেহাল দশা ও অন্যান্য সমস্যা

৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অর্ধেকের বেশি রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝের নোংরা পরিবেশে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডের সিংহভাগ বৈদ্যুতিক পাখা অচল থাকায় তীব্র গরমে স্বজনেরা বাসা থেকে টেবিল ফ্যান বয়ে এনে রোগীদের সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এছাড়াও, হাসপাতালের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও চরম ক্ষোভ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মহিলা ওয়ার্ডে পুরুষদের অবাধ বিচরণ এবং নিরাপত্তাহীনতা রোগী ও স্বজনদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। নার্সদের একাংশের দায়িত্বে অবহেলা, সময়মতো ওষুধ না দেওয়া এবং সুপেয় পানির চরম সংকট গরিব রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অসহায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরের দোকান থেকে বাড়তি মূল্যে পানি কিনে পান করতে হচ্ছে।

টিকিট কাউন্টার ও তথ্যসেবার অভাব

টিকিট কাউন্টারে কয়েকশ মানুষের দীর্ঘ লাইন থাকলেও মাত্র দুজন কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়ায় রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তথ্যকেন্দ্র বা দিকনির্দেশনা বোর্ড না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রবীণ ও জটিল রোগীরা প্যাথলজি ও কক্ষ খুঁজতে হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করছেন। তদুপরি পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থাকা কতিপয় চিকিৎসক ও কর্মচারীর প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে প্রশাসনিক জবাবদিহি ভেঙে পড়েছে।

কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও আশ্বাস

সম্প্রতি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে আসেন। নবযোগদানকৃত ইউএইচএফপিও ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্সকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, জরুরি বিভাগসহ খাবারের মান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শন করেন এবং সেবার মান বাড়াতে কঠোর নির্দেশনা দেন।

সার্বিক বিষয়ে ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্স গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু অনিয়ম আমার নজরে এসেছে এবং দ্রুত নতুন বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসকদের বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার এখতিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হওয়ায় কিছু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

উপজেলার একমাত্র সরকারি এই হাসপাতালে সেবার মান ফিরিয়ে আনতে, বায়োমেট্রিক হাজিরা সচল করা এবং সেন্ট্রাল রোস্টার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সীতাকুণ্ডের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]