ফল প্রকাশের তারিখ ও প্রশাসনিক জটিলতা
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণকে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রশাসনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। আগামী ২৯ অক্টোবর ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারকে কুমিল্লায় বদলি করা হয়। ফল প্রকাশের ঠিক আগে এমন আকস্মিক বদলির ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ফল প্রকাশের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মতি নেওয়া হয়নি কেন এবং এই দায় ঢাকা বোর্ডের সচিবের ওপর কেন বর্তাল?
সমন্বয়ের অভাব ও দায়ভার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনড় অবস্থানে ছিল। সেই অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এই তারিখ উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২৯ অক্টোবর ফল প্রকাশের বিজ্ঞপ্তি জারির আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিষয়টি অবহিত করা হয়নি। যদিও ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণ ও বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর ভূমিকা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

সূত্রের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের দায় শেষ পর্যন্ত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারের ওপর এসে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই দায় নিতে নারাজ। ফলস্বরূপ, তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হয়, যা ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন আগে ঘটে। এই বদলির সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
বদলির কারণ ও অভিযোগ
বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, সাধারণত যেকোনো দাপ্তরিক কাজের সঙ্গে বোর্ড সচিব সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। ফল সংক্রান্ত ইস্যুতে যোগাযোগে কোনো ঘাটতি থাকায় তার বদলির কারণ হতে পারে। এছাড়া, আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধা গ্রহণ সংক্রান্ত কিছু অভিযোগও এই ঘটনার সঙ্গে সামনে আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকা অপরিহার্য। সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে প্রয়োজনীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বা অবহিতকরণ না হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণে প্রশাসনিক দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আসা স্বাভাবিক। তবে এ ঘটনায় সচিবকে বদলির বিষয়টি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা ক্যাডারের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিবের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে। তাকে এ জন্যই বদলি করা হয়ে থাকতে পারে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বদলি হওয়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, “এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে আমার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। ফল প্রকাশের তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। এ বিষয়ে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না।”
আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পরীক্ষার প্রেক্ষাপট
এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গত ২ জুলাই শুরু হয়। লিখিত পরীক্ষা ৮ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে স্থগিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ায় ওই বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ৯ সেপ্টেম্বর। এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন।


