পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। বছরের পর বছর নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলেও এই সংকট কাটছে না। বিশেষ করে উপজেলার দুর্গম চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের বিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে একজন বা দুজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হচ্ছে। কোথাও আবার প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও করতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
শিক্ষক সংকটের মূল কারণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরও দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে তাদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। যোগদানের কয়েক বছরের মধ্যেই বদলি বা অবসরের কারণে পদগুলো পুনরায় শূন্য হয়ে পড়ছে। ফলে নতুন নিয়োগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বছরের পর বছর একই সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গলাচিপা উপজেলায় মোট ১৯৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৯৬টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১২০ জন। ৬৫টি পদ শূন্য এবং ১০টি পদ মামলাজনিত কারণে সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১ হাজার ১২টি, যার বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮৯৩ জন। সহকারী শিক্ষকের ১১৯টি পদ শূন্য রয়েছে। ৫৫ জন সহকারী শিক্ষক বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় আটটি বিদ্যালয়ে মাত্র দুই-তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে।

চর কাজল ও চর বিশ্বাসের ভয়াবহ চিত্র
উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট। এই দুই ইউনিয়নে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১২৮টি হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৫৯ জন। অর্থাৎ ৬৯টি পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। এই ২৫টি বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৫ হাজার ৫১১ জন। সে হিসাবে কর্মরত প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৯৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বাস্তবে, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একই সময়ে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে হচ্ছে, যা মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
নিয়োগ ও বদলির প্রভাব
শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে গলাচিপা উপজেলায় ৩৮ জন শিক্ষক নিয়োগ পান, যার মধ্যে ৯ জন চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নে যোগদান করেন। ২০২৪ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৭ জনের মধ্যে আরও ৬ জন এই দুই ইউনিয়নে যোগ দেন। দুই বছরে মোট ১৫ জন শিক্ষক যোগদান করলেও, তাদের মধ্যে তিনজন চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং একই সময়ে নয়জন শিক্ষক অবসরে গেছেন। ফলে নতুন নিয়োগ সত্ত্বেও শিক্ষক সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
চলতি বছরের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গলাচিপা উপজেলায় ৪৫ জন শিক্ষক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫ জনকে চর কাজল ও চর বিশ্বাস ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। তবে এই দুই ইউনিয়নেই যেখানে ৬৯টি পদ শূন্য, সেখানে নতুন সুপারিশপ্রাপ্ত সবাই যোগদান করলেও সংকট পুরোপুরি কাটবে না। এছাড়া, বর্তমানে ১৭ জন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে এবং পাঁচজন শিক্ষক অবসরের কাছাকাছি রয়েছেন। এসব বদলি ও অবসর কার্যকর হলে কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ
মধ্য চর কাজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান মিলন বলেন, “একটি শ্রেণিকক্ষে তিনটি ক্লাস একসঙ্গে নিতে হয়। ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থীকে একজন শিক্ষক দিয়ে মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয়। তারপরও দায়িত্ব পালন করছি।”
দক্ষিণ চর বিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পারভেজ হাসান জানান, “বেশির ভাগ সময় একাই তিনটি শ্রেণির ক্লাস নিতে হয়। পাশের উপজেলায় দুর্গম ভাতা আছে, আমাদের নেই। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এভাবে ক্লাস নেওয়া খুবই কঠিন।”
শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তাদের ওপর পাঠদানের বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে একাধিক শ্রেণি সামলাতে গিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে সময় দেওয়া এবং পাঠে পিছিয়ে পড়াদের ঘাটতি পূরণের সুযোগ কমে যাচ্ছে। এই শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের ওপর, যা অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।


