শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

নাব্য সংকটে শিবচরের নদ-নদী: অস্তিত্ব হারাচ্ছে 'মরা আড়িয়াল খাঁ'সহ একাধিক প্রবাহ

ডেস্ক রিপোর্ট
২ ঘণ্টা আগে
নাব্য সংকটে শিবচরের নদ-নদী: অস্তিত্ব হারাচ্ছে 'মরা আড়িয়াল খাঁ'সহ একাধিক প্রবাহ
নাব্য সংকটে শিবচরের নদ-নদী: অস্তিত্ব হারাচ্ছে 'মরা আড়িয়াল খাঁ'সহ একাধিক প্রবাহ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার একসময়ের খরস্রোতা নদ-নদীগুলো বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে। নাব্য সংকট, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং তীর দখলের কারণে এগুলোর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। অনেক নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে, কিছু শুকিয়ে ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে, আবার কিছু বর্ষায় পানি পেলেও শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ চরে পরিণত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন নিয়মিত খনন না হওয়া এবং অপরিকল্পিত ভরাট ও দখলের কারণেই এই করুণ দশা।

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় নৌপথ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় যে নদীগুলো দিয়ে লঞ্চ, ট্রলার ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করত, সেগুলোর অনেক অংশ এখন পলি ও কাদায় ভরাট হয়ে গেছে। এলাকাবাসী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন এবং দখল-দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন।

নদ-নদীর বর্তমান চিত্র ও সংকট

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় কাগজে-কলমে ১৭টি নদ-নদী থাকলেও দৃশ্যমান রয়েছে মাত্র ১০টি। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পদ্মা, পালরদী ও ময়নাকাটাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর মধ্যে এই ১০টিই টিকে আছে। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় জেলার বেশ কয়েকটি নদী নাব্য হারিয়েছে এবং কিছু নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে। শিবচরের শিরুয়াইল, নিলখী, বাঁশকান্দি, শিবচর পৌর এলাকা, পাচ্চর ও দ্বিতীয়াখণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

News details square ads
  • মরা আড়িয়াল খাঁ: শিবচরের শিরুয়াইল থেকে নিলখী হয়ে প্রবাহিত আড়িয়াল খাঁ নদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে ‘মরা আড়িয়াল খাঁ’ নামে পরিচিত। পলি জমে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে এটি শুকিয়ে যায় এবং অনেক স্থানে চাষাবাদ করা হয়।
  • ময়নাকাটা নদী: শিবচর পৌর এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ময়নাকাটা নদীও নাব্য সংকটে অস্তিত্বের হুমকিতে। বর্ষায় পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে পানি শুকিয়ে যায়। নদীর তলদেশে পলি জমার পাশাপাশি দুই তীরের বিভিন্ন অংশ ভরাট ও দখলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলেই নদীর তীরসহ বিভিন্ন অংশ ভরাট করে দখল করা হয়েছে। এমনকি শিবচর পৌরসভার ‘ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী (দাদাভাই) শিবচর উপশহর’ নদীর চরাংশেই গড়ে উঠেছে।
  • বিলপদ্মা নদী: শিবচরের বাঁশকান্দি ইউনিয়নের বিলপদ্মা নদীও নাব্য সংকটে বিপর্যস্ত। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় নদীটির দুই তীরে চর জেগে উঠেছে এবং প্রবাহপথ সংকুচিত হচ্ছে। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল করত।
  • পদ্মা সংলগ্ন এলাকা: পদ্মা-সংলগ্ন মাদবরেরচর এলাকাসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশেও শুকনো মৌসুমে চর জেগে ওঠে। পদ্মা সেতুর আশপাশেও বিস্তীর্ণ চর দৃশ্যমান।

স্থানীয়দের উদ্বেগ ও দাবি

শিরুয়াইল এলাকার বাসিন্দা রানা হামিদ বলেন,

‘আমাদের শিরুয়াইল বাজারের পাশের নদীটি এখন আর নদী নেই! এটা আড়িয়াল খাঁ নদেরই অংশ। একসময় এটি বড় নদী ছিল, যার এখন কোনো গতিপথই নেই। নদীর মাঝে বর্ষায় পানি জমে আর শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়; এমনকি এখন সেখানে ফসল ফলানো হচ্ছে।’
তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বাঁশকান্দি ইউনিয়নের শুম্ভুক গ্রামের বাসিন্দা জরিনা খাতুন বলেন,

‘আমাদের বাড়ির পাশের বিলপদ্মা নদী কালের বিবর্তনে এখন অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ ও ট্রলার চলত, আর এখন চর পড়ে নদী শুকিয়ে গেছে।’
তিনি অবিলম্বে পরিকল্পিত খননের দাবি জানান।

স্থানীয়রা মনে করেন, নদ-নদী কেবল পানিপ্রবাহের পথ নয়, বরং কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌযোগাযোগ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। নদী ভরাট হয়ে গেলে বর্ষার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, জলজ পরিবেশ এবং নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। তাই নদীগুলোর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভরাট বন্ধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খননের জোরালো দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

শিবচরের বিশিষ্ট সমাজসেবক বাবুল গোমস্তা বলেন,

‘আমরা একটি পরিকল্পিত শিবচর চাই। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ময়নাকাটা নদী রক্ষা করা জরুরি। এই নদীকে রক্ষা করতে পারলে তবেই পরিকল্পিত শিবচর গড়ে তোলা সম্ভব।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন,

‘শিবচরের নদীগুলো রক্ষার জন্য আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাচ্ছি। তবে বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীটির সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত চিত্র বের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির জানান,

‘শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে এই মুহূর্তে নদীটি খনন বা পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম আমাদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নদী উদ্ধারের আশার কথা শোনা গেলেও আপাতত নির্দিষ্ট কোনো ড্রেজিং প্রকল্প না থাকায় স্থানীয়দের মাঝে হতাশা রয়ে গেছে। নদীগুলোর সীমানা ও বর্তমান প্রবাহপথ চিহ্নিত করা, নাব্য যাচাইয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা পরিচালনা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন এবং দখল-ভরাট রোধে কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]