সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষা দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টেকা সম্ভব নয়: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মুখস্থ বিদ্যা এবং কেবল সার্টিফিকেট-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষা দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এজন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে গবেষণা ও আধুনিক উদ্ভাবনের দিকে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে।
আজ সোমবার (১৮ মে) সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত 'ট্রান্সফর্মিং হাইয়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি' শীর্ষক বিশেষ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈশ্বিক র্যাংকিং ও গবেষণার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে পারছে কিনা—এমন একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছাতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণা, মানসম্মত প্রকাশনা, সাইটেশন ও নতুন উদ্ভাবনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে দেশের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের আরও নিবিড়ভাবে চিন্তাভাবনা করার এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ ও কর্মসংস্থান
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) অভিঘাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানো টেকনোলজি এবং ৫জি প্রযুক্তির মতো উন্নততর প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন সনাতনী চাকুরির বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।"
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে দেশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সামগ্রিক শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করেন, শিক্ষা এখন কেবল ব্যক্তির পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সক্ষমতা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি।
একাডেমিক-ইন্ডাস্ট্রি শক্তিশালী মেলবন্ধন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ
উচ্চশিক্ষাকে অর্থবহ করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের (Industry-Academia) মধ্যে একটি সুদৃঢ় সংযোগ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন:
হাতে-কলমে শিক্ষা: প্রাথমিকভাবে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ইন্টার্নশিপ ও এপ্রেন্টিসশিপ কার্যক্রম চালু করা।
স্টার্টআপ ও সিড ফান্ডিং: শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী আইডিয়াকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপান্তর করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট দেওয়া হবে।
বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট ও সায়েন্স পার্ক: প্রতিটি প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে 'উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট' এবং 'সায়েন্স পার্ক' প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষা: উচ্চশিক্ষা ছাড়াও স্কুলপর্যায় থেকেই কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে কারিকুলামে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ স্ট্রাটেজিস্ট টম গুডউইনের একটি বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, "বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই; জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক নিজে কোনো কনটেন্ট তৈরি করে না; আলিবাবার নিজস্ব কোনো গুদাম নেই এবং এয়ারবিএনবির নিজস্ব কোনো রিয়েল এস্টেট নেই। তারা প্রত্যেকেই শুধুমাত্র একটি 'স্মার্ট ইন্টারফেস' ও অভিনব আইডিয়া দিয়ে বিশ্ব শাসন করছে। এটিই হলো প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জ্ঞানের শক্তি।"
'শিক্ষার্থীরা প্রাণ, এলামনাইরা মেরুদণ্ড'
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিল সমৃদ্ধ করতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের (Alumni) এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, "বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রম মূলত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অর্থ-বিত্তে প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে হবে।" তিনি মন্তব্য করেন, "শিক্ষার্থীরা যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, তবে এলামনাইরা হলো তার মেরুদণ্ড।"
মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের রাজপথের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দেশে আজ একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন এবং মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মেধা পাচার রোধ করে মেধার যথাযথ বিকাশ ও লালনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।" তবে এই প্রযুক্তিগত ও আধুনিক অগ্রযাত্রার মাঝেও সমাজ ও রাষ্ট্রের চিরায়ত ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কর্মশালার বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে একটি সম্মাননা স্মারক বা ক্রেস্ট উপহার দেন।
কর্মশালায় অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন:
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন
শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক
ইউজিসি সচিব ফখরুল ইসলাম
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাগণ এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষাঙ্গন এর আরও খবর
প্রাথমিকে জুলাইয়ের মধ্যে পঠন ও গণিত দক্ষতা নিশ্চিতের তাগিদ: অবহেলায় শিক্ষকদের শাস্তির হুঁশিয়ারি
শিক্ষা খাতে যুগান্তকারী সংস্কার: জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য ও আধুনিকায়নে মহাপরিকল্পনা
এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: উত্তরপত্র ও সরঞ্জাম বিতরণে ঢাকা বোর্ডের নতুন নির্দেশনা
কাল থেকেই শুরু প্রাথমিকের ছুটি, ৬ জুন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে সব বিদ্যালয়
ব্রাইট স্কুলে ছাত্রীর আত্মহত্যা: চেয়ারম্যানের বিচারের দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস
শিক্ষার্থীদের মানসিক ও আর্থিক চাপ কমাতে অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বড় সিদ্ধান্ত
