শিক্ষাপথ
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]

রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন: শিক্ষায় বড় বরাদ্দ, তবে 'থোক বরাদ্দ' নিয়ে বিতর্ক

শিক্ষাপথ ডেস্ক
১৬ দিন আগে
রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন: শিক্ষায় বড় বরাদ্দ, তবে 'থোক বরাদ্দ' নিয়ে বিতর্ক
রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন: শিক্ষায় বড় বরাদ্দ, তবে 'থোক বরাদ্দ' নিয়ে বিতর্ক
Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৬০ ]

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নতুন এই উন্নয়ন বাজেটে একদিকে যেমন শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে, অন্যদিকে বড় অংকের 'থোক বরাদ্দ' রাখা নিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মনে তৈরি হয়েছে নানা জিজ্ঞাসা।

বাজেটের মূল উৎস ও ব্যয়ের রূপরেখা

News details square ads

অনুমোদিত ৩ লাখ কোটি টাকার মূল এডিপির সিংহভাগ আসছে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের একটি বড় অংশ। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করা হবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সরকারের সর্বমোট উন্নয়ন ব্যয়ের আকার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকারও বেশি।

উন্নয়ন পরিকল্পনার ৫টি মূল স্তম্ভ

এবারের উন্নয়ন বাজেট ও পরিকল্পনাকে মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। প্রথম স্তম্ভে রয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার, যার অধীনে বিচার ও আইনি সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক কাজের ডিজিটালাইজেশন, আধুনিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সামাজিক বিনিয়োগকে প্রধান লক্ষ্য করা হয়েছে। তৃতীয় স্তম্ভে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং চতুর্থ স্তম্ভে দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জন্য সুষম উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবশেষে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে সামাজিক সংহতি জোরদার করার বিষয়টিকে পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

খাত ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ: শীর্ষে পরিবহন, দ্বিতীয় স্থানে শিক্ষা

বরাদ্দের ক্ষেত্রে এবারও ভৌত অবকাঠামো তথা যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে সামাজিক খাতের মধ্যে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন কর্মসূচির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ।

পরিবহন খাতের পরই সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা খাতে, যার পরিমাণ ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। এরপর যথাক্রমে স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা পেয়ে শীর্ষে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার অনুকূলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগ বড় অঙ্কের বরাদ্দ পেয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে বিশাল 'থোক বরাদ্দ': বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত

এবারের উন্নয়ন কর্মসূচির সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত দিকটি হলো বিশাল অঙ্কের থোক বরাদ্দ বা অনির্দিষ্ট ব্যয়ের সুযোগ রাখা। সরাসরি নির্দিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ না রেখে মোট বাজেটের একটি বড় অংশ রাখা হয়েছে বিভিন্ন থোক বরাদ্দের অধীনে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে ৩৮ হাজার ২৭ কোটি টাকা এবং সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে আরো ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় থোক বরাদ্দ হিসেবে রয়েছে ৫৯ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা।

বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের চলমান প্রকল্পগুলোর তুলনায় থোক বরাদ্দের আকার অনেক বেশি হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বিস্মিত হয়েছেন। যেমন—স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ যেখানে মাত্র ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, সেখানে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এছাড়া কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগেও ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন বাজেটের এত বড় অংশ (প্রায় ৩৯%) সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে 'থোক' বা অনির্দিষ্ট আকারে রাখায় তা অপচয় হতে পারে। এতে বাজেট বাস্তবায়নের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও কার্ডভিত্তিক বিশেষ সহায়তা

তৃণমূলের মানুষের বৈষম্য দূর করতে সামাজিক সুরক্ষা খাতের মোট ১৭ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন সহায়তার আওতায় বিশেষ কার্ড কর্মসূচিতে বড় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের প্রান্তিক পরিবারগুলোর সহায়তায় 'পরিবার কার্ড' কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কৃষি খাতের উন্নয়নে সরাসরি কৃষকদের সহায়তায় 'কৃষক কার্ডের' জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সম্মানী বাবদ আরও ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প সংখ্যা ও বাস্তবায়ন তাগিদ

নতুন এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি অনুমোদিত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প রয়েছে ৪৩টি। এর বাইরে আরও ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্প তালিকায় রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হবে। এছাড়াও আগামী জুনের মধ্যে ২২৩টি প্রকল্প সম্পূর্ণ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক সুষম উন্নয়ন ও নীতি নির্দেশনা

এবারের এডিপিতে দেশের উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে পণ্য পরিবহনের প্রধান হাব হিসেবে গড়ে তোলা, উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার রূপরেখা এতে যুক্ত করা হয়েছে।

এনইসি সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যে প্রকল্পগুলো আগামী জুন ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করা সম্ভব, সেগুলোকে দ্রুত অর্থায়ন করে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলোতে নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধি কঠোরভাবে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

Advertisement[ বিজ্ঞাপন — ৯৭০×৯০ ]